সাঁওতাল বিদ্রোহ ‘ হুল

শান্তনু দত্তচৌধুরী

সাঁওতালে দুর্বল হেরি বাঙালি বেহারি

ঢুকিছে সাঁওতাল গ্রামে খেলিছে চাতুরী

কোথাও বসেছে তারা’

ব্যাপারীর বেশে

সাঁওতাল ক্রেতার ডাকে সমাদর হেসে;

বেচিছে কাঁচের বালা ঝুটা মতির হার

বিলাতি বিলাস দ্রব্য বিচিত্র বাহার;

চারিগুণ মূল্যে তাই কিনিছে সাঁওতাল

পরিবর্তে ঘৃত মধু শস্য বাঘচাল,

বেহারি ব্যাপারী আসি সাঁওতালের

হাটে কিনিছে সাঁওতাল পণ্য মিথ্যা তৌল বাটে;

এক সের স্থানে লয় দুই সের তুলি

প্রতারণা দাগাবাজি, মুখে মিষ্টি বুলি।

ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে অখ্যাত লোককবি লোকনাথ দত্ত তাঁর ১৮ সর্গের ‘ সাঁওতাল কাহিনি ‘ কাব্যে সাঁওতাল বিদ্রোহের কারণ ও ফলাফল বর্ণনা করে গিয়েছেন। সহজ সরল আদিবাসীদের ওপর জমিদার ,দেশিয় মহাজন, ব্যাপারী,ভূস্বামী ও তাদের পৃষ্ঠপোষক ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কীভাবে শোষণ ও অত্যাচার চালাত এই কাব্যে তার বর্ণনা আছে।১৭৯৩ সালে লর্ড কর্ণওয়ালিস চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তন করার পর নব্য জমিদাররা কোম্পানির সাহায্যে সাঁওতালদের তাঁদের চিরাচরিত আবাসস্থল ও অরণ্য থেকে উচ্ছেদ করতে থাকে।নতুন ব্যবস্থায় বিব্রত সাঁওতালরা দলভূম, মানভূম,ছোটনাগপুর, পালামৌ ছেড়ে দলে দলে উত্তরে রাজমহল পাহাড়ের দিকে চলে যেতে শুরু করল।জঙ্গল হাসিল করে এই নতুন এলাকা তারা চাষযোগ্য করে তোলে।এই নতুন এলাকাকে ‘দামিন-ই-কোহ ‘ বলা হতো।

এবার কোম্পানি ও তাদের দেশীয় অনুচরদের প্রলুব্ধ দৃষ্টি গিয়ে পড়ল এই নতুন এলাকার ওপর।ওই সময়ের ‘ ক্যালকাটা রিভিউ’ তে একজন লেখক লিখেছেন ‘জমিদার,পুলিশ, রাজস্ব আদায়কারী ও আদালত সবাই মিলে শান্ত ও নম্র সাঁওতালদের ওপর নানারকম অমানবিক জুলুম চালাত।সাঁওতালরা ভাল ব্যবহার পর্যন্ত আশা করতে পারত না’।

এই সময় নতুন রেলপথ নির্মাণের সময় ক্রমাগত অত্যাচার ও মহিলাদের সম্ভ্রমহানির মতন ঘটনাও ঘটতে থাকে।এই নির্মাণের ফলে ওই অঞ্চলের মানুষের জীবনে যে দুর্যোগ নেমে আসে তার মর্মন্তুদ বর্ণনা দিয়েছেন অজ্ঞাত সাঁওতাল লোককবি:-

‘ এ ফুল দেলা ফুল

রেলগাড়িরে দেজংক

কুল

দুমকা জেলা ঞ্চেল ,

রেলগাড়িরে বৌঞ্চ ঞ্চেল

দুমকা জেলা হড় দরে

হালেঢালে ‘।

অর্থাৎ:—

‘ ও ফুল চল ফুল

রেলগাড়িতে উঠ

দুমকা জেলা দেখ,

রেলগাড়িতে উঠবো না,

দুমকা জেলা দেখবো

না,

দুমকা জেলার মানুষ

বড় দুঃখে বেঁচে আছে’।

১৮৫৫ সালের ৩০ জুন সাঁওতাল পরগনার ভাগনাডিহি গ্রামে দশ হাজার মানুষের এক সভায় সাঁওতাল নেতা সিদো ও কানহু আহ্বান জানান ইংরেজ সরকার ও তাদের তাবেদার জমিদার ,ব্যবসায়ী , মহাজনদের শাসন ও শোষণের অবসান ঘটানোর।ভাগনাডিহির ঐ সমাবেশ থেকে ঘোষণা করা হয় যে কুমোর, তেলি,কামার, মোমিন সম্প্রদায়ের জোলা, চামার ও ডোমেরা তাঁদের সহযোগী।ওই দিনই ওই বাহিনি কলকাতার দিকে অগ্রসর হতে থাকে।তাঁদের যে সমস্ত অভিযোগ স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ক্রমাগত অস্বীকার করছিল তার বিরুদ্ধে বড়লাটের কাছে অভিযোগ জানান তাদের উদ্দেশ্য ছিল বলে মনে হয়।

কিন্তু পথে তাদের সশস্ত্র পুলিশবাহিনী বাধা দিলে সংঘর্ষ শুরু হয়।৭ জুলাই অত্যাচারী ও কুখ্যাত মহেশ দারোগা নিহত হলে তারা স্থির করেন যে সাঁওতালদের ‘ হুল ‘ বা বিদ্রোহ শুরু হয়ে গিয়েছে।সাঁওতালদের অভিযান রুখতে মেজর বারজ এবার সেনাবাহিনী নিয়ে বাধা দিলে যুদ্ধ শুরু হয়।কিন্তু কয়েক ঘন্টা সংঘর্ষের পর বেশ কিছু মৃতদেহ ফেলে রেখে তিনি পালিয়ে যান।ইংরেজ বাহিনী পাকুর দুর্গে গিয়ে আশ্রয় নেয়।১২ জুলাই সিদো ও কানহু পাকুর রাজবাড়ী ও পাকুর দুর্গ দখল করেন।এবার এই বাহিনি মুর্শিদাবাদের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। বীরভূম থেকে ভাগলপুর পর্যন্ত এলাকায় ব্রিটিশ শাসন কার্যত বিলুপ্ত হয়ে যায়।১৮৫৫ সালের ১০ নভেম্বর বিদেশি সরকার সামরিক আইন জারি করে এই সমগ্র এলাকার শাসনভার সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেয়।

তারপর যা ঘটেছিল সে সম্পর্কে বর্ণনায় হান্টার সাহেব তাঁর Annals of Rural Bengal গ্রন্থে এক মেজর সাহেবের এই কথাগুলি উদ্ধৃত করেছেন :-

‘ আমরা যা করেছি তা যুদ্ধ নয়।আত্মসমর্পণ কাকে বলে সাঁওতালরা তা জানতনা।যতক্ষণ তাঁদের মাদল বাজত তাঁরা দাঁড়িয়ে থেকে যুদ্ধ করতে করতে গুলিতে মারা যেত।আমাদের সৈন্যবাহিনীতে একজন সিপাইও ছিল না যে এরজন্য লজ্জা অনুভব করত না।’

‘ হুল ‘ বা বিদ্রোহের সর্বশ্রেষ্ঠ নেতা সিদো গ্রেফতার হন।চার ভাইয়ের মধ্যে এই অগ্রজকে গুলি করে হত্যা করা হয়।বীরভূমের সীমান্তে আরেক যুদ্ধে কানহু’র মৃত্যু হয়।ভাগলপুরের কাছে এক ভয়ংকর যুদ্ধে অন্য দুই ভাই চাঁদ ও ভৈরব প্রাণ বিসর্জন দেন।

ঐতিহাসিক এল নটরাজন এক হিসাবে দেখিয়েছেন পঞ্চাশ হাজার বিদ্রোহীর মধ্যে অন্তত পনের থেকে পঁচিশ হাজার বিদ্রোহী নিহত হন।১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহ ছাড়া ভারতবর্ষে আর কোনো গণসংগ্রামে এত মানুষ নিহত হয়নি।সাঁওতাল বিদ্রোহ স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক গৌরবোজ্জল অধ্যায়।

এই ‘ হুল ‘ বা বিদ্রোহের শহীদদের অমর স্মৃতির প্রতি অন্তরের শ্রদ্ধা নিবেদন করছি।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published.