প্রধান শর্ত আর.এস.এস বিরোধিতা

শুদ্ধ ব্যানার্জিঃ

রাহুল গান্ধী কয়েকদিন আগে একটা তাৎপর্যপূর্ণ কথা বলেছেন। বিরোধী ঐক্যের সলতে পাকানোয় অগ্রণী ভূমিকা নিয়ে তিনি বলেন-” আরএসএস ও মোদি বিরোধী দলগুলোকে নিয়ে বিরোধী ঐক্য হোক।”
চিন্তাশীল রাহুল একটি কথায় বুঝিয়ে দিলেন যে আরএসএস র বিরুদ্ধে আদর্শগত লড়াই করাই আসল উদ্দেশ্য। দ্বিতীয়ত, মোদি বিরোধী হওয়া মানেই আরএসএস-বিরোধী হওয়া নয়। অর্থাৎ কোন কোন দল মোদি বিরোধী হলেও আরএসএস র প্রতি নরম।

পোষা মিডিয়া ও তৃণমূল এই কারণেই রাহুলের উপর খড়গহস্ত থাকে। কিন্তু রাহুলের এমন কথার পিছনে কী থাকতে পারে?

বেশ, হাতে গরম আসানসোল লোকসভা উপনির্বাচনে শত্রুঘ্ন সিনহার অপ্রত্যাশিত বিপুল জয়ের কথা ধরা যাক।

তৃণমূলের জমানাতে গত দু বারের লোকসভা নির্বাচনে আসানসোল জয় করে বিজেপি।তৃণমূল হারে। অবাঙালি মানুষের বিপুল সংখ্যা সম্পন্ন আসানসোলে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, ধর্মীয় মেরুকরণ, রামনবমীর মিছিল, বিশ্ব হিন্দু পরিষদের কার্যকলাপ সব বহাল তবিয়তে শিকড় গেড়ে বসেছে আরএসএস র দৌলতে।বাবুল সুপ্রিয়কে মোদি মন্ত্রীও করেছে। সেখানে বিজেপির জেতাই স্বাভাবিক বা হারলেও কম ভোটে হারবে এটাই প্রত্যাশিত ছিল। অন্যদিকে, তৃণমূলের ওই আসন থেকে জয়লাভ করা ইজ্জতের লড়াই ছিল।

তবু কী এমন ঘটলো যে তৃণমূল আদবানি ঘনিষ্ঠ, প্রায় বছর আশির ‘বহিরাগত’ প্রার্থী,আরএসএস প্রিয় শত্রুঘ্ন কে বিহার থেকে এনে দাঁড় করালো?তৃণমূলের কাছে তো লোকসভার জন্য যোগ্য প্রার্থীর অভাব ছিল না। এমনও নয় যে শত্রুঘ্ন তার বৃদ্ধ বয়সে লোকসভায় কথার ফুলঝুরি ছোটাবেন মোদির বিরুদ্ধে। তাছাড়াও, সেটা তৃণমূলের কাছে গুরুত্বপূর্ণ কাজ নয় কারণ তাহলে ডায়মন্ডহারবারের সুবক্তা সাংসদ গত দুই অধিবেশনে লোকসভা থেকে বেপাত্তা থাকতো না।

বেশ সেক্ষেত্রে তৃণমূল যা খুশি তাই করতে পারে মেনে নিলাম। কিন্তু 2019এ সাড়ে তিন লক্ষ ভোটে হারা শত্রুঘ্ন ঠিক কার এবং কিসের আশ্বাসে দু দু বার হারা এই আসনে এই বৃদ্ধ বয়সে নির্বাচন লড়তে ভিন রাজ্যে এলেন? নিশ্চয় আসানসোলের হেরো পার্টি তৃণমূলের আশ্বাসে নয়। তাহলে? তার ওপর 2019এ বিজেপি এ রাজ্যে 18টা সাংসদ ও বিধানসভায় 77টা বিধায়ক জিতে রেকর্ড করেছে। সুতরাং, দু লাখ ভোটে হারা আসানসোল তারা এইবারে তিন লক্ষ ভোটে জিতবে এমন অপ্রত্যাশিত ফলের আশ্বাস শত্রুঘ্ন পেলেন কী করে? তাও আনিস খান হত্যা, তপন কান্দু ও অনুপম দত্ত হত্যা,বগটুই গণহত্যা কান্ড ও ধর্ষণের সারি সারি ঘটনা, ১৯ দিনে পাঁচটি সিবিআই তদন্ত, এসএসসি ও নানাবিধ দুর্নীতির তদন্তের আবহে?

সাধারন মানুষ আন্দাজ করতে পারেন যে চিত্রতারকারা নিজেদের সম্বন্ধে একটু অতিরিক্ত বেশি সচেতন। তারা লড়াই করে বাঁচতে হবে শ্লোগানে বিশ্বাস করে রাজনীতি ঠিক করে না। ব্যতিক্রম হলেন, জয়ললিতা।কিছুটা রাজ বব্বর।সেক্ষত্রে, বৃদ্ধ শত্রুঘ্নের এমন নিশ্চিন্ত সিদ্ধান্ত প্রশ্ন জাগায় বৈকি।

এখানেই প্রশ্ন আসে তাহলে কী এমন ঘটলো যে উত্তরপ্রদেশে ও উত্তরাখণ্ডে জেতার পরেই আসানসোলের বিজেপির ভোটাররা কোন অদৃশ্য আদেশে সদলবলে শত্রুঘ্ন কে ভোট দিলেন?কী সেই রহস্য।

রাহুল গান্ধীর দৃষ্টিভঙ্গির এটাই প্রমাণিত সাফল্য যে উনি সত্য ও ভবিষ্যৎ বুঝতে পারেন এবং স্পষ্টভাবে বলেন।তাই আরএসএস বিরোধী না হলে শুধুমাত্র মোদি বিরোধী হয়ে আরএসএস র এজেন্ডা চালানোর জন্য ছদ্ম বিরোধী দলকে লড়াইতে চান না রাহুল।এই লড়াই তিনি দলের মধ্যেও করছেন ও কীটনাশক ব্যবহার করছেন যথাযথভাবে।

তৃণমূল ক্ষমতায় আসার আগে বিজেপির সঙ্গে জোট এবং ক্ষমতায় থাকাকালীন রাজ্যে আরএসএস র শাখার কয়েক শতগুণ সংখ্যায় বৃদ্ধি এই সন্দেহকে অবশ্যই জোরদার করে।আর বিজেপির নির্বাচনী সাফল্য তো বাংলার বিশ্ব রেকর্ড!!
কংগ্রেস ছাড়াও কেরলের বিজয়ন ও দিল্লির কেজরিওয়ালের কাছে তৃণমূলের বিজেপি কে পরাস্ত করার দাবী তাই ম্লান হয়ে যায়।

এসব কোন কথাই উঠত না যদি আমরা দেখতে পেতাম সিবিআই, ইডি সারদা, নারদ, কয়লা-বালি-গরু-সোনা পাচারের তদন্ত দ্রুততার সঙ্গে শেষ করতে পদক্ষেপ করছে, রাজীব কুমার অপাপবিদ্ধ রাজকুমারের মত ঘুরে বেড়াচ্ছেন না, তৃণমূল বিজেপি শাসিত রাজ্যের মূল বিরোধী দল কংগ্রেসকে ভাঙাতে সক্রিয় হচ্ছে না ইত্যাদি। কিন্তু তা তো হচ্ছে না।হচ্ছে উল্টোটাই। তৃণমূলের সামনে বঙ্গ বিজেপি ভেঙে তছনছ হচ্ছে।ঠিক কী উদ্দেশ্যে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির বাংলায় পাওয়া প্রবল ও প্রথম সাফল্য বিজেপি হেলায় নষ্ট হতে দিচ্ছে? কারা এর কারিগর?

তার ওপরে দেশের অবিজেপি দলগুলির মধ্যে একমাত্র তৃণমূলের শিরায় শিরায় ‘কংগ্রেস প্রভাব মুক্ত’ বিরোধী ঐক্য গড়ে তোলার প্রবল উৎসাহ ও প্রচেষ্টা উৎকটভাবে দেখা দিচ্ছে। এই নিয়ে দুইবার শরদ পাওয়ার তৃণমূলের এই পরিকল্পনার মাথায় জল ঢেলে দিয়েছেন।কারণ একজন শিশুও বলতে পারবে যে কংগ্রেসের মত এতবড় সংগঠন আর কোন বিরোধী দলের কাছে নেই। কিন্তু তবুও তৃণমূল এ বিষয়ে অদম্য। কিন্তু কেন? কার চাপ?কার প্রভাব?কিসের বিনিময়ে?

শেষে একটি সাম্প্রতিক ঘটনার উদাহরণ দিই। উত্তরপ্রদেশে বিধানসভা নির্বাচনের মধ্যে কর্ণাটকে যখন হিজাব বিরোধিতার নামে আরএসএস-বিজেপি ধর্মীয় বিভাজনের পরিচিত খেলায় নামে তখন রাজনৈতিক স্বার্থ দূরে রেখে প্রিয়াঙ্কা গান্ধী স্পষ্টভাবে বলেন-“মেয়েরা কী পোশাক পরবে সেটা মেয়েদের সিদ্ধান্ত ও স্বাধীনতা। তারা চাইলে বিকিনিও পরতে পারে।” আরএসএস র বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে লড়াই করার এটাই সাহস ও আদর্শবোধ।
আর অন্যদিকে ‘কংগ্রেস মুক্ত বিরোধী ঐক্য’ গড়তে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ও ভোটের আগে হিজাব পরে ভোট চাওয়া নেত্রীকে যখন সাংবাদিকরা হিজাব নিয়ে প্রশ্ন করতে যায় উনি থামিয়ে দিয়ে বলেন “আবার বাজে প্রশ্ন কেন করছ”?

হিজাবের প্রশ্নকে বাজে প্রশ্ন কারা বলে এবং কেন বলে?

এখানেই রাহুল গান্ধীর সাবধানবাণীর মর্মার্থ লুকিয়ে আছে। আরএসএস বিরোধীতাই হোক বিরোধী ঐক্যের প্রথম শর্ত। সর্ষের মধ্যে গেরুয়া ভূত ঢুকে থাকলে ভূত তো আরো জাঁকিয়ে বসবেই।

ভূত তাড়াও।তার জন্য সর্ষে ছেঁকে নেওয়া আগে প্রয়োজন।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published.