বঙ্গভঙ্গ এবং জাতীয় কংগ্রেসের কর্মকান্ডে তার অভিঘাতঃ

পার্থ মুখোপাধ্যায়

এরপর অবিভক্ত বাংলার ইতিহাসে একটি ঘটনা শুধু এই বাংলারই রাজনৈতিক চিত্র বদলে দেয়নি, তার অনিবার্য অভিঘাতের প্রতিফলন ঘটে এই বাংলার সেই সব মানুষদের চিন্তায় এবং কর্মকান্ডে, যারা রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রের ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ ও অনুপ্রাণিত ছিলেন। সেই সুদূরপ্রসারী ঘটনাটি হলো তৎকালীন বড়লাট লর্ড কার্জনের দ্বারা ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ। অবিভক্ত বাংলার, বিশেষ করে পশ্চিমাংশের বাঙ্গালিরা এই বঙ্গভঙ্গ মেনে নেয়নি। শুরু হয় প্রতিবাদ, যা ক্রমে ক্রমে ছড়িয়ে পড়ে সমাজের বৃহত্তর অংশে। এই বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের সময় জাতীয় কংগ্রেসের ভাবধারায় অনুপ্রাণিত এই বাংলার বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেসের মানুষরাও এতে অংশগ্রহণ করেন। শুধুমাত্র বাৎসরিক অধিবেশনের চার দেওয়ালের বাইরে এই প্রথম বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেসের সদস্যদের আন্দোলনের ময়দানে দেখা গেল, যা এই আন্দোলনকে শক্তি ও গতি যোগালো। এই আন্দোলন চরম শিখরে পৌঁছয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নেতৃত্ব দানের মাধ্যমে। এই বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রসের সম্পর্কের সম্পৃক্তকরন ঘটে যখন ১৯০৮ সালে অবিভক্ত বাংলার পাবনায় আয়োজিত বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেসের বাৎসরিক অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। রবীন্দ্রনাথের বড় বোন স্বর্ণকুমারী দেবীর রাষ্ট্রীয় কংগ্রেসের ১৯৮৯ সালের অধিবেশনে প্রথম মহিলা ডেলিগেট হয়ে যোগ দেওয়ার পর ১৯০৮সালে পাবনার বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেসের বাৎসরিক অধিবেশনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সভাপতিত্ব বাংলা তথা ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সঙ্গে ঠাকুরবাড়ির আত্মিক সম্পর্কের এক উজ্জল পরিচয় বহন করে। বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেসের সদস্যদের ও আপামর মানুষের যুক্ত আন্দোলনের ফলস্বরূপ ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রোধ হয়। এছাড়াই বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেসী মনোভাবাপন্ন মানুষরা জাতীয় ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় কংগ্রেসের জন্যে চার দেওয়ালের বাইরে রাস্তায় নেমে জনগনের সঙ্গে মিশে আন্দোলনের দ্বারা এক ভিন্ন পথের দিশা দেখিয়েছিলো। বঙ্গভঙ্গ রোধের বিনিময়ে রাজধানী কোলকাতা থেকে সরিয়ে দিল্লিতে নিয়ে যাওয়া হয়।

এর পরবর্তীতে কলকাতায় পুনরায় অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয় ১৯১১ সালে। কলকাতার ১৯১১ সালের এই অধিবেশন এক চরম ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে অনুষ্ঠিত হয়েছিলো। এই বছরেই একদিকে যেমন ১৯০৫এর বঙ্গভঙ্গ রদ হয়েছিলো, তেমনই অপরদিকে ফলস্বরূপ রাজধানী কলকাতা থেকে সরিয়ে দিল্লিতে নিয়ে যাওয়া হয়। এছাড়াও আরও একটি বিশেষ কারনে ১৯১১র কলকাতা অধিবেশন ঐতিহাসিক, কেননা প্রথমবার এই মঞ্চেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত জন গন মন গানটিও গাওয়া হয়েছিলো। কলকাতা জাতীয় কংগ্রেসের ইতিহাসে এক অনন্য নজির সৃষ্টি করে, যেখান অনুষ্ঠিত অধিবেশনেই বন্দে মাতরম এবং জন গন মন, দুটিই প্রথম গাওয়া হয়েছিলো। এটা বোঝাই যাচ্ছিলো যে ১৯১১ সালের বঙ্গভঙ্গ রদের ঘটনা কংগ্রেসের জাতীয় রাজনীতিতে বাংলা ও বাঙ্গালির উপস্থিতিকে একটা পৃথক মর্যাদায় স্থাপন করেছিলো। এরপর ১৯১৪ সালে যথাক্রমে মাদ্রাজের অধিবেশনে ভুপেন্দ্রনাথ বসু, ১৯১৫ সালে তৎকালীন বোম্বাই শহরের অধিবেশনে সত্যেন্দ্র প্রসন্ন সিনহা এবং ১৯১৬ সালে লখনৌ অধিবেশনে অম্বিকাচরণ মজুমদার সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন, অর্থাৎ পরপর তিন বছর তিনজন বাঙ্গালি রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন, যা এক অত্যন্ত বিরল এবং গৌরবজনক ঘটনা। এরমধ্যে ১৯১৬র লখনৌ অধিবেশন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, কেননা সেই বছর একচুক্তির মাধ্যমে জাতীয় কংগ্রেসের এবং মুসলিম লীগের যৌথ অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়।

পরের বছর ১৯১৭ সালে পুনরায় রাষ্ট্রীয় অধিবেশন কলকাতায় অনুষ্ঠিত হয়, যা এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেছিলো। ঐ বছর অ্যানি বেসান্ত নাম্নী জন্মসূত্রে একজন ইংরেজ প্রথম মহিলা সভাপতি হিসাবে নির্বাচিত হন।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published.