যখন জঙ্গল ঘিরে ধরে

শুদ্ধ ব্যানার্জি

শেক্সপিয়রের ম্যাকবেথ নাটকে তিন ডাইনির ভবিষ্যৎবাণী ছিল ,যে যেদিন জঙ্গল হেঁটে এগিয়ে আসবে সেদিনই শুধু ম্যাকবেথকে পরাজিত করা যাবে।

ক্ষমতালোভী, নৃশংস একনায়ক ম্যাকবেথ ধরেই নিয়েছিলেন যে তিনি চিরজয়ী কারণ বন জঙ্গল কখনো হাঁটতে পারে না। কিন্তু মাথায় গাছ লাগিয়ে যেদিন তার বিরোধী সেনানায়ক ও আদিবাসীরা মিলে বর্নম বনের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে আসে তখন একা হয়ে যাওয়া ম্যাকবেথ দেখেছিল যে বন জঙ্গলও এগিয়ে এসে তাকে শেষ করতে পারে।সে এক রক্তক্ষয়ী অধ্যায়।

গত ৪৫ বছর ধরে এই অহমিকা ধ্বংস হওয়ার সাক্ষী হয়েছে পশ্চিমবঙ্গ। একটা দলের অহমিকা চূর্ণ হয়েছে। আরেক একনায়িকা সেই পথেই।ম্যাকবেথ যেন মরেও অমর।

পশ্চিমবঙ্গ দেশের সেই হতভাগ্য রাজ্য যেটি স্বাধীন ভারতের ৭৫ বছরের মধ্যে দুই তৃতীয়াংশ সময় বা টানা অর্ধ শতাব্দী দুটি আঞ্চলিক দলের শাসনে রয়েছে। দুটি দলই তাদের দুর্বল সংগঠন ও অর্থনৈতিক অবস্থা শক্তিশালী করার জন্য এই রাজ্যের উপর নির্ভর করছে। ফলে দলের নিয়ন্ত্রণ বেড়েছে এবং রাজ্য ভারতের মূল স্রোতের উন্নয়নের থেকে ক্রমশঃ দূর থেকে দূরে সরে গেছে। পৌঁছে গেছে এক কোণে।
রাজ্য থেকে সংখ্যাগরিষ্ঠ সাংসদরা বিরোধী আসনে বেশি ভাগ সময় বসেছে সাম্প্রতিক কালে। দ্বিতীয় ইউপিএ সরকারে অবশ্য এর ব্যতিক্রম ছিল।

বাংলা থেকে জেতা বিজেপির ১৮ সাংসদ সেভাবে কোন সম্মানের জায়গা পায়নি মোদি সরকারের মধ্যে। যদিও তাদের জয় ঐতিহাসিক।সুতরাং এই দুর্বল দলগুলোকে সমর্থন করে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ যেন নিজের কবর খুঁড়ে চলেছেন। ফলে তাদের সন্তানরা দুটো পয়সা রোজগারের তাগিদে আজ ঘর ছেড়ে বহুদূরে। সেখানে কাজ আছে। কারণ সেখানে অর্ধশতাব্দী জুড়ে রাজ্যের স্বার্থের আগে কোন দলের স্বার্থকে গুরুত্ব দেয়নি সেখানকার মানুষ।

একদিকে যেমন সর্ব ক্ষমতা গ্রাস করা দলগুলোকে আত্মঘাতী বলা যায় ঠিক তেমনি রাজ্যের মানুষকে ওই একই উপাধি থেকে মুক্তি দেওয়া মুশকিল।

আসলে উন্নয়নের যে ধারা কংগ্রেস আমলে হয়েছিল তা থেকে অন্য রাজ্যে সরকার বদল হলেও সেই ধারার বদল হয়নি। নরেন্দ্র মোদি গুজরাতে ও কেন্দ্রের নীতিতে তার বদলে আনতে চেয়েছে এবং হাত পুড়িয়ে ঋণের বোঝার নীচে চাপা পড়েছে। পশ্চিমবঙ্গেও একই ঘটনা ঘটেছে বাম আমলে কিন্তু তাদের জোর ছিল রাষ্ট্রায়ত্তকরণের দিকে ফলে বেকারত্ব হু হু করে বাড়লেও আর্থিক সমস্যা তৃণমূলের মত এত খারাপ হয়নি। তৃণমূল আমলে তো পুরোটাই মিথ্যা ও চুরি।

অথচ দু জমানাতেই ভোটের মাঠে শাসক দলের সাফল্য নজরকাড়া এবং বিরোধীদের দমনের নীতি সব সময়ই সক্রিয়। নির্বাচনী কারচুপি ও হিংসা দু আমলেই সারা দেশের মধ্যে অনন্য।

অর্থাৎ সেই ম্যাকবেথের মতোই সর্বময় থাকে বাংলার শাসক আর তাদের ভোট দিয়ে শক্তিশালী করে তোলা প্রজা তাদের অধিকারটুকু পাওয়ার জন্য তাদের সঙ্গে সংগ্রাম করে চলে। এ যেন সত্যিই এক গ্রীক ট্র্যাজেডি। বাঙালীর অনেক গুণ কিন্তু একটি কোন চরম খামতি আছে হয়তো যার জন্য বাঙালি ও বাংলা ক্রমশঃ কয়েক দশকে পিছনের সারিতে পৌঁছে গেল।বাঙালি প্রকৃতই গ্রীক ট্রাজেডির নায়ক।

তৃণমূল আমলে আজ দুর্নীতি, হিংসা, অরাজকতার, নৈতিকতার অপরাধীকরণে শীর্ষে, তথাকথিত বুদ্ধিজীবীদের একাংশের আচরণ পুতিগন্ধময়, মুখ্যমন্ত্রীর মুখ থেকে অপরাধ দমনের বদলে অপরাধকে যৌক্তিক আকার দেওয়ার চেষ্টা চলছে, আদালতে উকিলরা মারপিট করছে, বিচারককে স্বাধীনভাবে কাজ করায় বাধা দেওয়া হচ্ছে, ১৯ দিনে ৫টি মামলায় সিবিআই তদন্তের আদেশ দিয়েছেন মহামান্য আদালত, প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অধীর রঞ্জন চৌধুরী 355 ধারা প্রয়োগের আবেদন জানিয়েছেন, অন্যদিকে তৃণমূলের গোপন দোসর বিজেপি তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এখনো জল মেপে চলেছে। এই পরিস্থিতিতে বাংলার মানুষের একবার আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে এই প্রশ্ন করার দরকার আছে যে আমরা কি কোন দলের উন্নতির জন্য বলিপ্রদত্ত নাকি নিজেদের ও রাজ্যের উন্নতির জন্য সক্রিয় হব?

এখনই সে কথা না ভাবলে বর্নম বন কিন্তু রাজ্যকে কখন ঘিরে ফেলবে বোঝাই যাবে না।।সে হবে এক রক্তক্ষয়ী অধ্যায়।

( মতামত লেখকের ব্যক্তিগত)

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published.