লোক ঠকানোর বাজেট

পার্থ মুখোপাধ্যায়

মোদী সরকার আসার পর থেকেই কেন্দ্রীয়-বাজেটের সাধারন ধ্যান ধারনাগুলোও বদলে দিতে শুরু করেছে। রেল বাজেটের এখন আলাদা অস্তিত্ব নেই, যা বর্তমানে কেন্দ্রীয় বাজেটেরই অন্তর্ভুক্ত। এবারের ২০২০-২১ আর্থিক বছরের বাজেটেও আমরা জানতেই পারলামনা রেল দপ্তরের ব্যায় বরাদ্দ বা আগামী পরিকল্পনা। যেমন ইদানিংকালের বাজেটগুলির মতোই এবারেও বাজেটের ঘাটতি ঠিক কতো, তা জানাই গেলনা। এ ছাড়াও একটা অদ্ভুত ধারা মোদী সরকার চালু করেছে। বাজেটের বক্তৃতায় কোনো বিষয় যেমন ভাবে উপস্থাপন করা হয়, পরবর্তীতে বিশদ চর্চার পর দেখা যাচ্ছে আসলে তা আদৌ নয়! সোজা কথায় একটা লোক ঠকানোর প্রবনতা স্পষ্টত লক্ষ করা যায়, যেমন পূর্বে এমন ধারনা দেওয়া যেন ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত আয়কর মকুব অথচ তা আদৌ সত্য ছিলনা। আরো একটি প্রবনতা এবারের বাজেটে প্রতীয়মান, তা হলো বাজেট বক্তৃতায় এমন ভাবে কোনো কোনো বিষয়কে ঘোষণা করা হয়েছে যেন ব্যায় বরাদ্দ বৈপ্লবিক হারে বেড়েছে কিন্তু আসলে সেই বরাদ্দগুলি শুধুমাত্র ২০২০-২১ এর জন্য নয়, বরং তা দুই, তিন, চার, এমনকি পাঁচ বছরের জন্য।

নোটবন্দী ও অসময়ে ভুল জিএসটি প্রনয়নের দ্বারা যে সার্জিকাল স্ট্রাইক নরেন্দ্র মোদী দেশের অর্থনীতির ওপর করেছেন, তার ভয়ঙ্কর প্রভাব আজো অর্থনীতিতে বিদ্যমান। দেশের প্রায় ১২ কোটি মানুষ তাদের কর্মসংস্থান হারিয়েছেন। ছোটো এবং মাঝারি শিল্প প্রায় ধ্বংশের মুখে, যা আমাদের অর্থনীতির মেরুদন্ড। পরবর্তী সময়ে ভারতবর্ষের মানুষ আশা করেছিলো এবারের বাজেটে অর্থমন্ত্রী ছোটো ও মাঝারি শিল্প বা এমএসএমই ক্ষেত্রর জন্য এবং কর্মসংস্থানের লক্ষে বাজেটে বিশেষ ব্যবস্থার ঘোষনা করবেন। সমস্ত জল্পনার অবসান ঘটিয়ে এবারের বাজেটে ক্ষুূ্দ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য কিছুই করা হয়নি। এই সরকার ক্ষুূ্দ্র ও মাঝারি শিল্পের আকারের সংজ্ঞাটাই বদলে দিয়েছে, যার ফলে অপেক্ষাকৃত বড় শিল্পসংস্থাও এখন ক্ষুদ্র ও মাঝারি বলে গন্য হয়। এর ফলস্বরুপ, সত্যিকারের ছোটো শিল্পগুলি অপেক্ষকৃত বড় অথচ যারা এমএসএমই বলে গন্য হয়, এমন সংস্থাগুলির সঙ্গে প্রতিযোগিতার বিভিন্ন ক্ষেত্রে এঁটে উঠতে পারছেনা। এর ফলে আক্ষরিক অর্থে এবারের বাজেটে যা যা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, তার ফলে এমএসএমই ক্ষেত্রে অথবা কর্মসংস্থানের সৃষ্টির ক্ষেত্রে, কোনোটিতেই দেশীয় অর্থনীতির জন্য কোনোই আশার আলো দেখাতে পারছে না।

এই সময়ে যে ১০০ দিনের কাজের প্রকল্প সবচেযে বড় ভরসার হয়ে উঠতে পারতো, সেই প্রকল্পের বরাদ্দ্যও ১ লক্ষ ১ হাজার কোটি থেকে কমিয়ে ৭৩ হাজার কোটি টাকা করা হয়েছে। ফলে শুধু শহর নয়, গ্রামীন কর্মসংস্থান সৃষ্টিও এখন প্রচন্ডভাবে হ্রাস পেয়েছে।

এবারের বাজেটও মোদী সরকারের আর্থিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন। সরকারের সাধারন মানুষের হাতে নগদ অর্থ তুলে দিতে অনীহা, আর সেই ধারাই বজায় রাখলো এবারের বাজেট। ফলত বাজারে চাহিদা সৃষ্টির কোনো সুযোগ নেই, আবার চাহিদা না থাকার ফলে ক্রমে ক্রমে জোগানের অভাবও সৃষ্টি হয়েছে।

সবচেয়ে আশ্চর্যজনক হচ্ছে যে দুটি বিষয় এখন জনমানষে সর্বাপেক্ষা আলোচিত, যেমন কৃষিক্ষেত্রে এবং প্রতিরক্ষায় ব্যায়বরাদ্দ্য মুদ্রাস্ফতির কথা চিন্তা করলে বলাই যায় যে তা আসলে গতবারের চেযে কমই। অথচ, একদিকে সরকার কৃষকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধই ঘোষনা করেছে বলা যায় এবং অপরদিকে সীমান্তে চিন যে আমাদের জমি দখল করেছে বা অরুনাচলে গ্রাম তৈরি করেছে, তা আজ সরকার জোরালো ভাবে অস্বীকারও করতে পারছেনা। বর্তমান সরকার এই ক্ষেত্রে প্রমান করছে যে দেশের বা নাগরিকদের সার্বিক প্রয়োজন বা চাহিদার সঙ্গে এখনকার মোদী সরকারের বাজেটগুলি আর সম্পৃক্ত নয়।

শিক্ষা ও স্বাস্থের ক্ষেত্রের বরাদ্দকৃত অর্থ প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বাড়ানোর বলা হলেও, সরকারের অর্থ সংস্থানের কোনো নিশ্চয়তা বাজেটে নেই। এছাড়াও সরকার ঘোষনা করেই দিয়েছে যে বিভিন্ন উন্নয়ন খাতে কেন্দ্রীয় সরকারের দেয় অনুদান ক্রমে ক্রমে বন্ধই করে দেওয়া হবে। ফলে রাজ্যগুলির মোট বরাদ্দকৃত অর্থ আসলে ক্রমশ কমতেই থাকবে এবং তাদের কেন্দ্রের ওপর নির্ভরতা বাড়বে যা বিজেপির “হিন্দি, হিন্দু, হিন্দুস্তান” নীতির রুপায়নের অন্যতম ধাপ।

পরিশেষে, একটি কথাই বলা যায় তা হলো মোদী সরকার বাজেটকে একটি আনুষ্ঠানিকতায় পর্যবেশিত করেছে মাত্র, অর্থনৈতিক রোডম্যাপের নীতি নির্দেশিকা নয়।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published.