সততার পোস্টার বুকে সেঁটে ঘুরতে হয়নি তাঁকে

সিদ্দিক আলি

এই মানুষটাই নাকি স্টিফেন হাউস কিনে নিয়েছিলেন, যে রাজনীতি উত্তর জীবনে একটি ছোট্ট ফ্ল্যাটে কালাতিপাত করেছেন, খাবারের জন্য সঞ্চয় বলতে ছিল শুধুমাত্র টিনের মধ্যে কিছু পরিমাণ মুড়ি। মৃত্যুপথযাত্রী সেই অশীতিপর বৃদ্ধ সহজ সরল অনাড়ম্ভর গান্ধীবাদী নেতার এমন অবস্থা ছিল সে সময় যে চিকিৎসার সমস্ত খরচও তাঁর নিজের পক্ষে বহন করা সম্ভব হচ্ছিল না। সমগ্র জীবন সমাজসেবায় যিনি কাটিয়েছিলেন তাঁকেও এই বাংলায় এহেন কুৎসার শিকার হতে হয়েছিলো। এই মহান ব্যক্তি হলেন পশ্চিমবঙ্গের কংগ্রেসের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্ল চন্দ্র সেন।

স্বাধীনোত্তর ভারতবর্ষের প্রথম কুড়ি বছর (১৯৪৭-৬৭) রাজ্য শাসনের দায়িত্বে ছিলেন বিজ্ঞানের তিন কৃতি সন্তান— তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন প্রফুল্ল চন্দ্র সেন। প্রফুল্ল চন্দ্র সেন সমাজের মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে যেভাবে দিনের-পর-দিন কাজ করেছিলেন তার জন্য “আরামবাগের গান্ধী” নামেও তাঁকে আমরা চিনি।

তিনি ১৮৯৭ সালের ১০ই এপ্রিল অবিভক্ত বাংলার খুলনা জেলার সেনহাটি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বাবার নাম গোপাল চন্দ্র সেন এবং মা নগেন্দ্র বালা দেবী।

তিনি ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের প্রথম খাদ্যমন্ত্রী এবং তিনি এমন সময় খাদ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন, যে সময় ১৬ লক্ষ উদ্বাস্তু নিয়ে হিমশিম খাচ্ছিল ডঃ বিধান চন্দ্র রায়ের মন্ত্রিসভা। তার অভিজ্ঞতা এবং বিচক্ষণতায় সেই পরিস্থিতিকে সুন্দরভাবে কাটিয়ে উঠেছিলেন। খাদ্যমন্ত্রী হিসেবে বিশেষ অবদান হলো —অধিক ফলনশীল ধান। যাঁর সুদূরপ্রসারী চিন্তাশক্তির কল্যাণে আজ বাংলার মাঠ ১২ মাসেই সবুজ থাকে, তাঁকে তাঁর প্রাপ্য স্বীকৃতি আজও আমরা কতজন দিয়েছি?

১৯৬২ সালের ১লা জুলাই অকস্মাৎ প্রয়াত হন ডঃ বিধান চন্দ্র রায়। তখন অবধারিত ভাবেই মুখ্যমন্ত্রীত্বের গুরু দায়িত্ব এসে পড়লো প্রফুল্ল সেনের ওপর। সঙ্গে নিয়ে এলেন চব্বিশ বছরের মন্ত্রিত্বের অভিজ্ঞতা। প্রফুল্ল সেন ছিলেন People’s man—  তৃণমূল স্তরের মানুষের সঙ্গে ছিল তাঁর নিবিড় যোগাযোগ। আমলাতন্ত্র পরিচালিত সরকার এবং মানুষের মধ্যে ব্যবধান ঘুচিয়ে তিনি শুরু করলেন “আমদরবার”। গ্রামের গরিব মানুষও তাঁর কাছে অভিযোগ জানাতে পারতো। তিনি দরবারে মন্ত্রীদের নিয়ে বসতেন। অরবিন্দ কেজরিওয়াল ‘ আমদরবার’ নতুন কিছু নয়, অনেক আগেই হাতে-কলমে এবং আন্তরিকভাবে করে দেখিয়েছেন পশ্চিমবাংলার মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্ল সেন। প্রফুল্ল সেন মুখ্যমন্ত্রী হয়ে মন্ত্রিসভার কাজ শুরু করেছিলেন জেলায় জেলায় গিয়ে। কাজেই আজকের দিনে মমতা ব্যানার্জির জেলা ভ্রমণ টাও কিন্তু প্রফুল্ল সেন প্রথম হাতে-কলমে করে দেখিয়েছেন। উত্তরবঙ্গ এবং দক্ষিণবঙ্গের সমস্যা এক নয়।  আবার পুরুলিয়া বাঁকুড়া সমস্যা আর ২৪ পরগনা সমস্যাও ভিন্ন। কাজেই উপর থেকে বা প্রশাসনিক স্তর থেকে চাপিয়ে দেওয়া নীতি নয়, বরং মানুষের পাশে গিয়ে তার সমস্যাকে বোঝা এবং সেই অনুযায়ী সরকারী নীতি প্রণয়ন— এই ছিল তাঁর লক্ষ্য।

প্রফুল্ল সেন মুখ্যমন্ত্রী হয়ে আরও একটি কাজ করলেন—তা হল বিধানসভাতে বাংলা ভাষার ব্যবহার। এতদিন পর্যন্ত মন্ত্রী এবং সদস্যরা ইংরেজি ভাষাতেই তাঁদের বক্তব্য পেশ করতেন, কিন্তু প্রফুল্লবাবু মাতৃভাষাকে প্রাধান্য দিলেন।

১৯৬৩ সালে হলদিয়া প্রকল্প রূপায়ণের জন্য বিশেষ উদ্যোগ নেন প্রফুল্ল সেন। এই সময় কলকাতা পরিবহন সমস্যাও জটিল আকার ধারণ করেছিল। গঙ্গার উপর দ্বিতীয় সেতু নির্মাণ অত্যন্ত জরুরি হয়ে পরেছিল। বিদেশী বিশেষজ্ঞদের এনে এ ব্যাপারে একটি Blue print তৈরি করান তিনি।

মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে প্রফুল্ল সেনের  অবদান—
• উদ্বৃত্ত ফসলের লেভি Collection করে  F.C.I গোডাউনে মজুত করা ও রেশনিং ব্যবস্থাকে উন্নত করা ।

• রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন।
• ডালখোলা , গৌরীপুরে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র।
• কল্যাণীতে বহু শিল্প স্থাপন করেছিলেন
• কোলাঘাট ব্রিজ নির্মাণ ।
• গরিফা (নৈহাটি-ব্যান্ডেল) বিদ্যুৎ প্রকল্প।
• হরিণঘাটা দুগ্ধ প্রকল্পে মেয়েদের জন্য বিশেষ কাজের ব্যবস্থা করা ইত্যাদি।
• উদ্বাস্তু সমস্যা মোকাবিলায়, তাহেরপুর কলোনীতে প্রত্যেককে জমির পাট্টা প্রদান করেছিলেন।
• উদ্বাস্তুদের গৃহ নির্মাণের জন্য ১২৫০ টাকা করে লোনের ব্যবস্থা করেছিলেন।
• কুর্পাস ক্যাম্পের উদ্বাস্তুদের জন্য Relief amount বাড়িয়ে দিয়েছিলেন।

আজ যখন পশ্চিমবঙ্গে গণতন্ত্র ও নিজেদের সম্পদ বাড়ানোর স্বার্থে গণহত্যার লাল দাগ হাতে নিয়ে স্বঘোষিত কেউ বাংলার মেয়ে সততার প্রতীক , তো কারো  উন্নয়নের জোয়ারে ভাসছে কখনো বাংলা ঠিক সেই সময় প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠেন প্রফুল্ল চন্দ্র সেন। কখনো স্বঘোষিত ‘সততার প্রতীক’ অথবা ত্যাগের প্রতীক নয়…. প্রকৃত অর্থেই গান্ধীবাদী একজন সৎ সমাজসেবক যিনি সততা ও ত্যাগের প্রতীক ।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published.