নরেন্দ্র মোদি, জনসংঘ , বাজপেয়ী ও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ

শান্তনু দত্ত চৌধুরী

বাংলাদেশের স্বাধীনতার অর্ধ শতক পূর্ণ হল। একই সঙ্গে‌ এই বছর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম শতবর্ষ। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি এখনও অনেকের স্মৃতিতেই সজীব।

১৯৭১ এর ২৫ মার্চ মধ্যরাত থেকে বাংলাদেশে পাক সেনাবাহিনীর নারকীয় অত্যাচার শুরু হয়। ফলে বাংলাদেশে লক্ষ লক্ষ মানুষ নিহত হন।ধর্ষণ ,লুঠ , অগ্নি সংযোগ চলতে থাকে।বাংলাদেশের ১ কোটি মানুষ অসহায় হয়ে ভারতে আশ্রয় নেয়।ইন্দিরা গান্ধির নেতৃত্বে ভারত সরকার ও ভারতের জনসাধারণ তাঁদের পাশে দাঁড়ায়।অবশেষে ৯ মাস রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর পাকিস্তান সেনাবাহিনী ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ এ ভারতীয় সেনাবাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে।বঙ্গবন্ধু পাক কারাগার থেকে মুক্তিলাভ করে ১৯৭২ এর জানুয়ারি মাসে দেশে ফিরে আসেন।

স্বাধীনতা ও বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিকে অম্লান করে রাখতে বাংলাদেশ সরকার গত ২৬ মার্চ রাজধানী ঢাকায় যে বিশেষ কর্মসূচির আয়োজন করেছিলেন তাতে যোগ দিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ওই দিন ঢাকায় যান। জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডের অনুষ্ঠানে মোদি তাঁর বক্তৃতায় বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চ, ১৯৭১ এর সেই বিখ্যাত বক্তৃতা থেকে উদ্ধৃত করেন।

মোদি বলেন ‘নতুন প্রজন্মকে গর্বের সঙ্গে মনে করাতে চাই যে, বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামে সামিল হওয়াটা আমার জীবনের প্রথমদিকের আন্দোলনগুলির একটি ‘।তিনি জানান তিনি ও তাঁর বন্ধুরা বাংলাদেশ মুক্তি সংগ্রামের সমর্থনে সত্যাগ্রহ করে কারাবরণ করেছিলেন। ভারত সরকার এবছর গান্ধি শান্তি পুরস্কার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রদান করবার সিদ্ধান্ত নেয়। সভায় প্রধানমন্ত্রী মোদি তা বঙ্গবন্ধুর ছোট মেয়ে রেহানার হাতে তুলে দেন।

মোদির বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে সত্যাগ্রহ ও কারাবরণের দাবি নিয়ে রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে।মোদির এই আত্মপ্রচারের বিষয়টি নিয়ে যথেষ্ট কৌতুকের অবতারণাও হয়েছে। মোদির সমর্থনে অবশ্য বিজেপির আই.টি সেল আসরে অবতীর্ণ হয়েছে। তাঁরা টাইমস অফ ইন্ডিয়ার ১৯৭১ এর ১৩ আগস্ট সংখ্যায় প্রকাশিত একটি সংবাদ প্রচার করেছে।তাতে মুদ্রিত হয়েছে যে তৎকালীন জনসংঘ ৭১ এর আগস্ট মাসের ১ থেকে ১১ তারিখ পর্যন্ত বাংলাদেশকে স্বীকৃতির দাবিতে প্রচার চালায় ও ১২ তারিখ পার্লামেন্টের সামনে শান্তিপূর্ণ ভাবে তাদের সদস্যরা প্রতীকী কারাবরণ করেন।ওই প্রতীকী আন্দোলনে মোদি ছিলেন কিনা তা অবশ্য বোঝা গেলো না।একটি ভিডিও প্রচার করা হয়েছে।তাতে মোদিকে দেখা গেলো না।ওই আন্দোলনে যোগদানকারীদের কোনো কারাদন্ড হয়েছে বলে কিন্তু টাইমস লেখেনি, বাজপেয়ীও গ্রেপ্তার হননি।

ওই সমাবেশে জনসংঘ সভাপতি ও এম.পি অটল বিহারী বাজপেয়ী প্রদত্ত যে ভাষণ ছাপা হয়েছিল তা উদ্ধৃত করছি।বাজপেয়ীজি বলেছিলেন :

‌ ” Mr Vajpayee declared that the Indo — Soviet joint statement implied a ‘ conspiracy ‘ between New Delhi and Moscow to deny recognition to Bangladesh.He said the Indian Government was afraid of recognising Bangladesh because of the pressure from the Soviet Union as well as the Americans.”

বাজপেয়ী বাংলাদেশকে স্বীকৃতি না দেওয়ার জন্য নয়াদিল্লি ও মস্কোর মধ্যে ষড়যন্ত্রের তত্ব উপস্থিত করেন।পাঠক নিশ্চয়ই জানেন যে উপরোক্ত সমাবেশের আগেই ৯ আগস্ট,১৯৭১ তারিখে ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে ২৫ বছর মেয়াদী ভারত — সোভিয়েত মৈত্রী চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।এই মৈত্রী চুক্তি ছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম রক্ষাকবচ।সে প্রসঙ্গে পরে আসব।বাংলাদেশে পাক সেনাবাহিনীর বর্বর অত্যাচারের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও গণ প্রজাতন্ত্রী চীন ছিল নিশ্চুপ।শুধু তাই নয় বাংলাদেশে বর্বর গণহত্যার বিষয়ে তাদের বক্তব্য ছিল ওই ঘটনা পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয়।ইন্দিরা গান্ধি বলেছিলেন প্রতিবেশী দেশের ওই ঘটনাকে ভারত কখনই পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ঘটনা বলে এড়িয়ে যেতে পারেনা, বিশেষ করে যখন ১ কোটি শরনার্থী চরম দুর্ভোগের শিকার হয়ে ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করেছেন।

বাজপেয়ী তাঁর ওই আরো বলেন

“…. So long as India does not recognise Bangladesh and give it massive military assistance will not achive freedom”. জনসংঘের সভাপতি বাজপেয়ী এখানেই থামেননি, টাইমস অফ ইন্ডিয়া লেখে “In his opinion the delay in recognising Bangladesh was only an effort to stall for time and I think the New Delhi and Moscow Government want to find a solution within the framework of Pakistan”. লক্ষনীয় যে বাজপেয়ী তাঁর ভাষণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার প্রেসিডেন্ট নিক্সন প্রশাসনের বিরুদ্ধে একটি কথাও বলেননি।তাঁর যত আক্রমণ ভারত সরকার ও সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে।প্রকৃতপক্ষে জনসংঘের ওই তথাকথিত সত্যাগ্রহ ছিল ভারত – সোভিয়েত মৈত্রী চুক্তির বিরুদ্ধে। একই সঙ্গে জনসংঘ ও বাজপেয়ীর লক্ষ ছিল পাকিস্তানের পক্ষে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও চৈনিক সরকারের জোট গঠনের বিষয়টি আড়াল করা।৭১ এর মার্চ মাসে পাক সেনারা চরম অত্যাচার শুরু করে।কিন্তু জনসংঘ ও বাজপেয়ীর বাংলাদেশের সমর্থনে তথাকথিত সত্যাগ্রহ করতে ৭১ এর আগস্ট পর্যন্ত সময় লাগলো কেনো ? তাও ওই প্রতীকী আন্দোলন ছিল প্রকৃতপক্ষে ভারত – সোভিয়েত মৈত্রী বিরোধী প্রচার অভিযান।

বিকৃত ইতিহাস ও মিথ্যা প্রচার করা সঙ্ঘ পরিবার ও বিজেপির আই টি সেলের বড় গুণ। তারা এখন একথাও প্রচার করছে যে ইন্দিরা গান্ধির কাছ থেকে কোনও সুস্পষ্ট আশ্বাস না পাওয়ার জন্য বঙ্গবন্ধু ২৫ মার্চ রাতে পাক সেনাবাহিনীর কাছে ধরা দেন। হাস্যকর কথা।

তাহলে তাজউদ্দীন আহমেদ , সৈয়দ নজরুল ইসলাম, খোন্দকার মোস্তাক আহমেদসহ অসংখ্য নেতৃবৃন্দ ভারতে আশ্রয় পেলেন কী করে? এই বিজেপির আই.টি সেল আরেকটি মিথ্যা প্রচার শুরু করেছে।সেটি হল ২৭ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা করেছিলেন মেজর জিয়াউর রহমান , চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে।সর্বৈব মিথ্যা কথা। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধী সাম্প্রদায়িক শক্তি এই অপপ্রচার চালিয়ে থাকে।এখন দেখা যাচ্ছে বিজেপির আই.টি সেলও এই মিথ্যা প্রচারটি চালাচ্ছে।প্রকৃত ঘটনা হল ২৫ মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধু গ্রেপ্তার হবার আগেই ঢাকা থেকে ইপিআর – এর ওয়্যারলেসের ডিকোডেড মেসেজের মাধ্যমে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রদান করেন।এই ঘোষণাকে ভিত্তি করে ২৬ মার্চ কালুরঘাট বেতার থেকে প্রথমে আওয়ামি লিগের আব্দুল হান্নান , বেতার কেন্দ্রের বেলাল মোহাম্মদ, আবুল কাসেম সন্দীপ এবং ২৭ মার্চ মেজর জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেন।

এর পরের ঘটনাবলী ছিল :

১০ এপ্রিল তাজউদ্দিন আহমেদ প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধির পরামর্শে গণ পরিষদের সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার গঠনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা জারি করেন।১৭ এপ্রিল বাংলাদেশের প্রথম রাজধানী মুজিবনগরে ( তৎকালীন মেহেরপুর মহকুমার বৈদ্যনাথতলার পরিবর্তিত নাম)শপথ গ্রহণের শেষে দেশি বিদেশি সাংবাদিকদের সঙ্গে মন্ত্রীদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়।বঙ্গবন্ধু — রাষ্ট্রপতি ( তিনি তখন বন্দি ) , নজরুল ইসলাম – উপ রাষ্ট্রপতি (অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ) তাজউদ্দীন আহমেদ, প্রধানমন্ত্রী হন।অন্যান্য মন্ত্রীরা হলেন খোন্দকার মোস্তাক আহমেদ, ক্যাপটেন মনসুর আলি , এ.এইচ.এম কামরুজ্জামান।প্রধান সেনাপতি হন কর্নেল (অবসরপ্রাপ্ত) এম.এ.জি.ওসমানী।

১৯৭১ এর মে মাসের ‌দ্বিতীয় সপ্তাহের মধ্যেই গণ প্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধান দপ্তর স্থাপিত হয় কলকাতার ৮ নম্বর থিয়েটার রোডে ( শেকসপিয়র সরণি )।৫৭/৮ বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডে জাতীয় সংসদ সদস্য আব্দুল মান্নানের পরিচালনায় স্বাধীন বাংলাদেশ বেতার কেন্দ্রের কার্যক্রম শুরু হয়।

১২ জুলাই মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বাংলাদেশ সরকার ১১ জন নির্বাচিত সাংসদকে জন সংযোগ ও প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলার জন্য দেশের ১১ টি অঞ্চলে আঞ্চলিক প্রশাসক নিযুক্ত করেন।

মন্ত্রিসভার সচিবালয় গড়া হয় ও সচিবদের নিযুক্ত করা হয়।প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সচিব হন ব্যারিস্টার আমির উল ইসলাম। ড.মোজাফফর আহমেদ চৌধুরীকে প্ল্যানিং কমিশনের চেয়ারম্যান ও বিচারপতি আবু সৈয়দ চৌধুরীকে জাতি সংঘে বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলের নেতা মনোনীত করা হয়।

৭১ এর আগস্ট ‌মাসে সর্বদলীয় উপদেষ্টা পরিষদ গঠিত হয়।এর সদস্য ছিলেন মওলানা ভাসানী ( ন্যাপ ,ভাসানি‌ ) ,মণি সিংহ
(বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি ), মনোরঞ্জন ধর (বাংলাদেশ কংগ্রেস ),প্রফ. মোজাফফর আহমেদ‌ ( ন্যাপ,‌ মোজাফফর ), প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ ,খোন্দকার মোস্তাক আহমেদ,পররাষ্ট্র মন্ত্রী ও আওয়ামি লিগের আরো দুজন প্রতিনিধি।

প্রকৃত পক্ষে পূর্ব বাংলার মানুষের দীর্ঘ গণ সংগ্রামের প্রতি ইন্দিরা গান্ধি ও ভারত সরকার সহানুভূতিশীল ছিলেন এবং ৭১ এর ২৬ ও ২৭ মার্চ মন্ত্রিসভার জরুরী বৈঠকে কিছু অতি প্রয়োজনীয় সামরিক সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। বি.এস.এফ কে নির্দেশ দেওয়া হয় শরণার্থীদের এদেশে প্রবেশে কোনও বাঁধা না দেওয়া হয়।বাংলাদেশের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। ঘটনাগুলো থেকেই বোঝা যায় ভারত সরকার ওই দেশের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে কী রকম সমন্বয় রক্ষা করতেন।

ভারতের সামরিক হস্তক্ষেপ

বিজেপির আই.টি.সেল প্রচার করছে ভারতের উচিৎ ছিল প্রথমেই ব্যাপক সামরিক হস্তক্ষেপ (বাজপেয়ীর বক্তব্য দ্রষ্টব্য )করা অর্থাৎ যুদ্ধ ঘোষণা করা।মোদির ওই সময় সত্যাগ্রহে যোগ দেবার কাহিনী শুনে আপ্লুত তসলিমা নাসরিন লিখেছেন ইন্দিরা গান্ধির উচিৎ ছিল প্রথমেই সামরিক বাহিনী পাঠানো। অর্থাৎ বাংলাদেশের মানুষের পক্ষে বিশ্ব জনমত গঠন না করে সামরিক অভিযান চালানো। পাক – মার্কিন -চিন যুদ্ধ জোটের বিরুদ্ধে ভারতের একা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়া। সবাই যুদ্ধ বিশারদ ও সর্বজ্ঞ।

এবার ২৯ এপ্রিল ১৯৭১ এ কেন্দ্রীয় সরকারের অতীব জরুরি ক্যাবিনেট মিটিং এর সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেখা যাক।ওই সভায় ছিলেন জগজীবন রাম ( প্রতিরক্ষা ), ফকরুদ্দিন আলী আহমেদ ( কৃষি ), ওআই.বি.চ্যাবন ( অর্থ ) সরদার স্মরণ সিং ( বিদেশ ) এবং বিশেষ আমন্ত্রিত সেনাধ্যক্ষ শ্যাম মানেকশ।সভায় পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়ের পাঠানো বিপুল সংখ্যক বিপন্ন শরণার্থীর অবস্থা সম্পর্কে রিপোর্টটি পেশ করে দৃশ্যত অসন্তুষ্ট ইন্দিরা গান্ধি জেনারেল মানেকশকে জিজ্ঞাসা করলেন ‘ What you are doing ?’ ইন্দিরা গান্ধি দেশের সেনাপ্রধানকে বলেন ‘ I want you to walk into East Pakistan ‘. সেনাধ্যক্ষ বলেন
‘ that means war.’ স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে ইন্দিরাজির উত্তর ছিল ‘I dont mind if it is war.’ অবিচলিত মানেকশ সমগ্র পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে বলেন মে সেনাবাহিনীর এখনই আকস্মিক যুদ্ধ করার মতন প্রস্তুতি নেই। তিনি বলেন ” I have only 30 tanks and two armoured divisions with me.The Himalayan passes will be opening anytime.What if the Chinese give an ultimatam ? The rains will start now in East Pakistan.When it rains there the rivers become oceans.I guarantee 100 Percent defeat. ” মানেকশ তখনই আক্রমণের প্রস্তাব অনুমোদন করতে পারলেননা।তখনকার মতন সভা মুলতুবি থাকলো।বিকাল চারটায় আবার সভা বসল।দীর্ঘ আলোচনার পর সবাই চলে গেলে মানেকশ শ্রীমতী গান্ধির কাছে পদত্যাগ করতে চাইলে তিনি তাঁর সেনাপ্রধানকে রণকৌশল রচনা করার জন্য সময় দেন।

এর পরের ঘটনাবলী সবাই জানেন। ইন্দিরা গান্ধির অকল্পনীয় পরিশ্রম ও নেতৃত্বে বিশ্ব জনমত বাংলাদেশের পক্ষে সমবেত হয়।ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে মৈত্রী চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। প্রয়োজনীয় সামরিক সম্ভার
সংগ্রহ ও মজুত করা হয়।৭১ এর নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ইন্দিরাজি রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিয়ে বাংলাদেশে পাক সেনাদের নারকীয় অত্যাচারের ‌বিবরণ দেন।তিনি এর পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিক্সনের সংগে ওয়াশিংটনে গিয়ে সাক্ষাৎ করেন। খুবই হিমশীতল সাক্ষাৎকার।নিক্সন হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন পাকিস্তান যদি আক্রান্ত হয় তাহলে আমেরিকা নিশ্চুপ হয়ে বসে থাকবেনা।ইন্দিরাজি অত্যন্ত তাচ্ছিল্যের সঙ্গে নিক্সনের কথা শোনেন।

৩ ডিসেম্বর যুদ্ধ শুরু হয়।ভারতীয় সেনাবাহিনী দ্রুত অগ্রসর হতে থাকে।নিক্সনের নির্দেশে মার্কিন বিদেশ সচিব কিসিঞ্জার ইন্দিরা গান্ধিকে ফোন করে সেনা অভিযান বন্ধ করতে বলেন। ইন্দিরাজি তাকে বলে দেন এর কোনো সম্ভাবনাই নেই।এই কথা শুনে নিক্সন ক্রুদ্ধ আস্ফালন করেন ও ইন্দিরা গান্ধির উদ্দেশ্যে অনেক গালিগালাজ বর্ষণ করেন।

এই সময়ের ঘটনাবলী সম্পর্কে প্রফেসর গ্যারি বাস লিখিত ” The Blood Telegram ” একটি প্রামাণ্য গ্রন্থ।শুধু তাই নয় গত ২০২০ ‘ র‌ ৩ নভেম্বর গ্যারি ‌বাস নিউ ইয়র্ক টাইমস – এ একটি অতি বিশেষ নিবন্ধ লিখেছেন।যাতে সম্প্রতি রিচার্ড নিক্সনের প্রেসিডেন্সিয়াল আর্কাইভ প্রকাশ্যে আসার ( De classify করা হয়েছে )পর অনেক তথ্য জানা গিয়েছে।দেখা যাচ্ছে নিক্সন ইন্দিরা গান্ধি ও ভারতীয় মহিলাদের ক্রুদ্ধ ও নিষ্ফল আক্রোশে কীরকম গালাগালি দিতেন।

মার্কিন সপ্তম নৌবহর ভারত মহাসাগরে তাদের ঘাঁটি দিয়েগো গার্সিয়া থেকে বেরিয়ে বঙ্গোপসাগরের দিকে অগ্রসর হতে থাকে।এর পরই খবর আসে ২০ টি সোভিয়েত রণতরীও বঙ্গোপসাগরের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।এক অজানা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।কিন্তু এই পরিস্থিতিতে মার্কিন সপ্তম নৌবহর পিছিয়ে যেতে বাধ্য হয়।

ওই সময়ের একটি ঘটনা সম্পর্কে জানতে পারছি মোনায়েম সরকারের স্মৃতিচারণ থেকে। ইনি ওই সময় ন্যাপ ( মোজাফফর ) এর কলকাতা দপ্তরের সম্পাদক ছিলেন।তিনি লিখেছেন ” আগের রাতেই জানা গিয়েছে সপ্তম নৌবহর আসছে। জরুরী মিটিং উপদেষ্টা পরিষদের ৮ নং থিয়েটার রোডে। অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ সভায় গিয়েছেন।তাঁর সঙ্গে গিয়েছি।সবাই খুবই চিন্তিত ও উত্তেজিত। মৌলানা ভাসানী সাহেব প্রবীণ মানুষ। তিনি অবশ্য ইলিশ মাছ রান্না করতে ব্যস্ত।প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ, মোজাফফর সাহেব বারবার বলছেন মিটিংটা শুরু হোক। অবিচলিত ভাসানী সাহেব একসময় বললেন ‘মোজাফফর অত ছটফট করতাছ ক্যান।সপ্তম নৌ বহর লইয়া যা করার জহরলালের বেটি করবে।তুমি এখন ইলিশ মাছ খাও।”

১৬ ডিসেম্বর ঢাকায় পাক সেনাবাহিনীর কমান্ডার লে.জেনারেল নিয়াজী ভারতীয় সেনা ও মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মিলিত বাহিনীর কমান্ডার
লে.জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার কাছে আত্ম সমর্পণ করেন। ৯৫ হাজার পাক সেনা বন্দী হয়।এই যুদ্ধকে অবশ্য বিজেপির আই.টি সেল বলেছে ওই যুদ্ধটা নাকি ছিল ” দুটি বাহিনীর যুদ্ধ যার একটা কানা ও একটা খোঁড়া “।এই অন্ধ ভক্তরা বোঝাতে চায় অনেক বড়‌ যুদ্ধ করেছিলেন মোদি।ওই তথাকথিত সত্যাগ্রহ করে।

** আরো জানতে পড়ুন —–

১) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জীবনপ্রবাহ
— মোনায়েম সরকার , সপ্তাহ প্রকাশনী,
কলকাতা –৭০০০১২.

২) Dr M A Mannan Chowdhury/ Sharifa
Mannan (Edited ): International
Documents of great liberation war
of Bangladesh.

৩) Indira Gandhi : biography by
Pupul Jayakar

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published.