শিল্প সম্মেলনঃ হাতে রইলো পেনসিল?

—অনির্বাণ দত্ত

বেঙ্গল গ্লোবাল বিজনেস সামিটের আরেকটি সংস্করণ শেষ হওয়ার পরে থেকে গেল কিছু প্রশ্ন। এই মহাযজ্ঞ ২০১৫ সাল থেকে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অন্যতম প্রধান গর্বের বিষয়। এর ওয়েবসাইট অনুসারে “বেঙ্গল গ্লোবাল বিজনেস সামিট হল জোট গঠন, অংশীদারিত্ব বাঁধা এবং ব্যবসায়িক সুযোগগুলির একটি স্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি অর্জনের জন্য একটি আদর্শ প্ল্যাটফর্ম যা এই রাজ্য ব্যবসা সম্প্রসারণ, নতুন বিনিয়োগ, গ্রিন ফিল্ড ম্যানুফ্যাকচারিং প্রকল্প স্থাপন এবং সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের জন্য প্রদান করে।”
এবার দেখা যাক গত সাত বছরের বাস্তব পরিস্থিতিটি ঠিক কোন জায়গায়।

অক্টোবর ২০১৯ থেকে ডিসেম্বর ২০২১এর পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যায়, ভারতে মোট ৯৩৪১০৪.৩৮ কোটি টাকার (ইকুইটি শুধু) ফরেন ডিরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট (FDI) করা হয়েছে এবং মোট বিনিয়োগ থেকে ৮১২টি প্রস্তাব বাস্তবায়িত হয়েছে। এই সময়কালে পশ্চিমবঙ্গে এর মধ্যে FDI ইকুইটি এসেছে মাত্র ৬৮৪৩.১৩ কোটি টাকার, যা মোট FDI ইকুইটি বিনিয়োগের মাত্র ০.৭৩ শতাংশ (তথ্যসূত্র: QUATERLY FACT SHEET – FACT SHEET ON FOREIGN DIRECT INVESTMENT (FDI) FROM APRIL, 2000 to DECEMBER, 2021)। যদি ২০১৫-২০১৯ সাল পর্যন্ত গত পাঁচটি বেঙ্গল গ্লোবাল বিজনেস সামিটের পরিসংখ্যান দেখা যায়, তা হলে জানা যাচ্ছে মোট ১২,৩২,৮৫৭.১০ কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রস্তাব করা হয়েছিল (পশ্চিমবঙ্গ শিল্প উন্নয়ন নিগমের পরিসংখ্যান অনুযায়ী)। আবার কেন্দ্রীয় বাণিজ্য মন্ত্রকের পরিসংখ্যান শাখা, শিল্প ও আভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের উন্নয়ন বিভাগ (DPIT) দ্বারা দেওয়া পরিসংখ্যান এই  হিসাবের সম্পূর্ণ  বিপরীত চিত্র দেখায়। কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যান অনুসারে, ২০১৫ থেকে ২০১৯এ পশ্চিমবঙ্গ মাত্র ৩৭,৫০৪ কোটি টাকার industrial entrepreneurs memorandum (IEM) পেয়েছে, যা পশ্চিমবঙ্গ শিল্প উন্নয়ন নিগমের পরিসংখ্যানের ৩ শতাংশের কিছু বেশি।

এই পরস্পরবিরোধী পরিসংখ্যানগুলি রাজ্য সরকার বার্ষিক বেঙ্গল গ্লোবাল বিজনেস সামিটের যে চিত্রের উপস্থাপনা করেন তার থেকে একটি ভিন্ন চিত্র দেখায়।
এখন প্রশ্ন এই যে পশ্চিমবঙ্গে বিনিয়োগকারীরা স্বাগত বোধ করছেন না কি? যদি না করেন তা হলে তার মূল কারণ কি কি?
১. সুনির্দিষ্ট জমি অধিগ্রহণ নীতির অভাব – ‘ল্যান্ড ব্যাঙ্ক’ ধারণাটি এখনও বাস্তবায়িত হয়নি
২. অঞ্চলভিত্তিক পরিকাঠামোগত ঘাটতি
৩. পরিকাঠামোর সামগ্রিক উন্নয়নের দৃষ্টিভঙ্গির অভাব
৪. সিন্ডিকেট দৌরাত্ম
৫. আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ক্রমবর্ধমান অবনতি
তা হলে কি হাতে রইলো পেন্সিল?
বিভিন্ন ভারী এবং মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠান ঝাঁপ ফেলেছে বিগত চুয়াল্লিশ বছরে। কেউ শিকার জঙ্গি ট্রেড ইউনিয়নের, কেউ বা কালের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেদের নতুন ধারায় আধুনিকীকরণ করতে পারে নি, আর কেউ বা ব্যবসা চালানোর পুঁজিটুকুর সংস্থান করার মতো জায়গাতেই আর থাকতে পারে নি।
এই কারণ গুলোর সঙ্গে আর একটা বড় কারণ সরকার এবং জনপ্রতিনিধিদের অপরিনামদর্শীতা।

ডক্টর বিধানচন্দ্র রায়ের উত্তরসূরি পশ্চিমবঙ্গে আর জন্মান নি, যিনি একাধারে হবেন প্রশাসক, পেশাদার এবং ভিশনারী। তাই জন্য যে অঞ্চল যে শিল্পের উপযোগী নয়, সেই অঞ্চলে সেই শিল্পের বুনো হাঁস ধাওয়া করতে গিয়ে শিল্পও হয় নি, হাঁসও উড়ে গেছে।

শিল্পস্থাপন এতো সহজ নয়। তার পিছনে প্রচুর পেশাদারি পরিকল্পনা লাগে। আর দরকার পড়ে শিল্পবান্ধব পরিবেশ তৈরি করার। ইতস্ততঃ কিছু সেমিনার-কনফারেন্স-কনভেনশন-সামিট করে শিল্প স্থাপন করা যায় না। আর কল-কারখানা রাজ্যের কোথায় হবে, সেই সিদ্ধান্ত নিতে হয় পুরোপুরি প্রযুক্তিগত এবং অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে, কোনো অঞ্চলের প্রাকৃতিক সুবিধা, ভৌগোলিক সুবিধা, প্রযুক্তিগত সুবিধাকে নজরে রেখে। হ্যাঁ, এর সাথে কিছু পরিমাণ রাজনৈতিক লক্ষ্য এবং উপলক্ষ্য মিশে থাকতে পারে, যেমন কোনো অঞ্চলে শিল্পস্থাপন হলে স্থানীয় ভাবে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কর্মসংস্থান হয়। কিন্ত এর থেকে বেশি রাজনীতি (সিন্ডিকেট, কাটমানি, তোলাবাজি, ইত্যাদি ইত্যাদি) মিশে গেলেই বিপদ।

এই প্রসঙ্গে কিছু উপস্থাপনা এবং পরামর্শ:
প্রথমত, শিল্পবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। এই পরিবেশ গড়ে তুলতে সমস্ত রাজনৈতিক দলকে সামিল করতেই হবে। এর সম্পূর্ণ দ্বায়িত্ব হলো শাসক দলের। তাদের রাজনীতির উর্দ্ধে উঠে সকল রাজনৈতিক দলকে শ্রদ্ধাসহকারে আহ্বান জানাতে হবে এবং বিরোধীদের গঠনমূলক অংশগ্রহণের পরিসর দিতে হবে। আবার বিরোধীদেরও গঠনমূলক বিরোধিতার রাস্তায় চলার প্রয়োজন আছে। সমস্ত রাজনৈতিক দলকে রাজ্যের কথা ভেবে বিরোধিতা করার জন্যই বিরোধিতা করার সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে উপরে উঠতে হবে। এই প্রসঙ্গে বিশেষ উল্লেখযোগ্য শাসক এবং বিরোধী হিসেবে কেন্দ্রে এবং বিভিন্ন রাজ্যে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের ভূমিকা।

এর পরেই যেটা আসে তা হল সিঙ্গল উইন্ডোর ধারণা বাস্তবায়িত করতে হবে এবং লাল ফিতের ফাঁস থেকে প্রশাসনকে মুক্ত করতে হবে।
এর সঙ্গেই আসে পেশাদারিত্বের ভূমিকা। শিল্পের পরিকল্পনা এবং রূপায়ন করতে হবে চরম পেশাদারিত্বের সঙ্গে।

পশ্চিমবঙ্গের শিল্পস্থাপনের মুলগত সমস্যা হল জমি। জমি অধিগ্রহণের ব্যাপারে প্রশাসনকে দায়িত্ব নিতে হবে; ল্যান্ড ব্যাংক তৈরি করতে হবে; বন্ধ হয়ে যাওয়া কল-কারখানার জমি কি ভাবে আইনি জটিলতা কাটিয়ে অধিগ্রহণ করে পুনরায় উপযুক্ত (পরিবেশগত এবং প্রযুক্তিগত ভাবে) শিল্প স্থাপনের উপযোগী করে তোলা যায় তার পরিষ্কার রূপরেখা তৈরি করতে হবে।
এর সাথে সাথেই আসে পরিকাঠামোর গুরুত্ব। রাজ্যের প্রতিটি প্রান্তে উপযুক্ত পরিকাঠামো – সড়ক/রেল যোগাযোগ, স্থিতিশীল বিদ্যুৎ সরবরাহ, টেলি যোগাযোগ এবং ইন্টারনেট পরিষেবা – পৌঁছে দিতে হবে।
ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে নতুন এবং ভবিষ্যতের প্রযুক্তিকে কি ভাবে কাজে লাগানো যায় তার উপযুক্ত ক্ষেত্র তৈরি করতে হবে; নতুন প্রজন্মের উদ্যোগপতিদের ঋণের সুযোগ আরো সহজ করতে হবে; এবং মানবসম্পদের দক্ষতা আর উৎকর্ষতাকে বাড়ানোর জন্য ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে হবে।
সর্বপরি, মানুষকে ‘অনুপ্রাণিত’ করতে হবে নিজেদের পায়ে ভর দিয়ে সামনে এগোনোর জন্য।
( মতামত লেখকের ব্যক্তিগত)

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published.