কর্পোরেট লুট-এ সরকার সহায়তা করছে — বললেন  রাহুল গান্ধি।

শুভাশিস মজুমদারের বিশেষ প্রতিবেদন, ৯ সেপ্টেম্বর ঃ

‘ভারত জোড় পদযাত্রা’-র ঠিক আগে দিল্লির রামলীলা ময়দানে ৪ সেপ্টেম্বর, রবিবার, কংগ্রেস আয়োজিত এক সুবিশাল জনসভায় রাহুল গান্ধি বলেন যে নাগরিকরা যদি সাংবিধানিক বৈশিষ্ট রক্ষায় ব্যর্থ হয়, ভারত গণতন্ত্র হিসাবে টিকে থাকবে না। তিনি অভিযোগ করেন যে সরকারের প্রবণতা সমস্ত ভিন্নমতকে চূর্ণ করার এবং প্রাতিষ্ঠানিক বাধাগুলি সরিয়ে কর্পোরেট লুটকে সহজতর করা। “হামারা সম্বিধান দেশ কি আত্মা হ্যায়। ইসকি রক্ষা কর্ণা, ইসকো বচানে কা কাম হার নাগরিক কো কর্ণা পড়েগা। আগর হাম আজ না খাড়ে হুয়ে, তো ফির ইয়ে দেশ না বাঁচেগা (আমাদের সংবিধান দেশের প্রাণ। প্রতিটি নাগরিককে তা রক্ষা করতে হবে। আজকে আমরা না দাঁড়ালে এই দেশ বাঁচবে না)।”

                 রাহুল যুক্তি দেন যে সরকারের অন্যায় কাজ প্রকাশ্যে আনার জন্য বিরোধীদের কাছে উপলব্ধ রাজনৈতিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক উপায়গুলি ইতিমধ্যেই নষ্ট করে ফেলা হয়েছে এবং শুধুমাত্র জনপ্রতিরোধই দেশকে বাঁচাতে পারে।

           প্রাক্তন কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধি, যিনি ৭ সেপ্টেম্বর থেকে ভারত জোড়ো যাত্রার নেতৃত্ব দিচ্ছেন, বলেন যে বর্তমানের ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব, ক্রমবর্ধমান দ্রব্যমূল্য এবং সামাজিক বৈষম্য সরাসরি এক বিশেষ রাজনীতির ফল যা সাংবিধানিক আদর্শের বিরুদ্ধে নির্লজ্জভাবে কাজ করে চলেছে। “এই দেশটি সংবিধানের উপর ভিত্তি করে। এই দেশ তার জনগণের কণ্ঠস্বর, জনগণের ভবিষ্যতের সঙ্গে সম্পর্কিত। এ দেশ দুই শিল্পপতির নয়। এই দেশ জনগণের,” তিনি বলেন।

             রাহুল বলেন যে মিডিয়া এবং অত্যাবশ্যক গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলির উপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ থাকায়, এবং সংসদের প্রকৃত অর্থপূর্ণ ব্যবহারকে এবং রাস্তার প্রতিবাদকে সরকারের গুরুত্ব না দেওয়ায়, গণযোগাযোগের মাধ্যমে জনগণের সাথে সরাসরি কথোপকথন করাই একমাত্র সম্ভাব্য উপায় হিসেবে রয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন যে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ঘৃণা ও ভয়ের রাজনীতি উদ্দেশ্যমূলকভাবে দুই বড় শিল্পপতির স্বার্থে নীতি বাস্তবায়নের সুবিধার্থে তৈরি করা হয়েছে। “মেহঙ্গাই, বেরোজগারি অর নফরাত সে দেশ মজবুত হোতা হ্যায় কেয়া (মুদ্রাস্ফীতি, বেকারত্ব এবং ঘৃণা কি দেশকে শক্তিশালী করে)?” তিনি এই প্রশ্ন করে আরো বলেন যে সরকার কর্পোরেট-পন্থী নীতিগুলি কার্যকর করার জন্য জনগণকে আবেগপ্রবণ ইস্যুতে আবদ্ধ রাখতে চায়।

             রাহুল স্মরণ করান যে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরে মোদীর প্রথম কাজটি ছিল জমি অধিগ্রহণ আইনকে বিনষ্ট করার চেষ্টা করা এবং সদ্য বাতিল হওয়া কৃষি আইনের প্রবর্তন এই প্রবণতার ধারাবাহিকতাকে প্রকাশ করেছে। তিনি তাঁর বক্তৃতায় এই সরকারের দ্বারা কর্পোরেট ট্যাক্স কমিয়ে দেওয়া এবং ১০ লক্ষ কোটি টাকার ব্যাঙ্ক ঋণ মকুব করে দেওয়ার তীব্র সমালোচনা করেন।

 রাহুল বলেন যে নভেম্বর ২০১৬-এর নোটবন্দীকরণ, ত্রুটিপূর্ণ জিএসটি লাগু করা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগগুলিকে দুর্বল করা এবং দু’জন শিল্পপতির কাছে সরকারি-ক্ষেত্রের সম্পদ হস্তান্তর করার ক্ষেত্রে সরকারের এই প্রবনতাই দেখা গেছে। ‘ঘৃণা-প্রকল্পে’র সাফল্যের জন্য দেশে ভয় ছড়িয়ে দেওয়া অপরিহার্য ছিল।         

              রাহুল বলেন, “ভারত ভয়ের কবলে পড়েছে। উচ্চহারে মূল্যবৃদ্ধির ভয়, বেকারত্বের ভয়, ভবিষ্যতের ভয়। এই ক্রমবর্ধমান ভয় ঘৃণার বিস্তারকে সহজতর করছে। ঘৃণা সমাজকে বিভক্ত করছে এবং দেশকে দুর্বল করছে। মোদী গত আট বছরে ইচ্ছাকৃতভাবে দেশকে দুর্বল করেছেন।”

 রাহুল বলেছেন: “আমি আপনাদের জিজ্ঞাসা করতে চাই, ভয় এবং ঘৃণা থেকে কে লাভ করে? কার স্বার্থে আরএসএস-বিজেপি ঘৃণা ছড়ায়, ভয় তৈরি করে? তারা কেন এটা করছে? এতে কি গরীব, কৃষক, যুবক, শ্রমিক, ছোট দোকানদারের উপকার হয়? না, মাত্র দুজন শিল্পপতি এই অস্বাভাবিক পরিস্থিতির সবচেয়ে বেশি সুবিধা পাচ্ছেন। আপনারা অন্য শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীদের জিজ্ঞাসা করুন, তাঁরা বলবেন তাঁরা লাভ করেননি। সবকিছু—বন্দর, বিমানবন্দর, সড়ক, রেলপথ, টেলিকম, তেল—দুই জনের কাছে যাচ্ছে।”

                 তিনি বলেন যে উচ্চহারে মূল্যবৃদ্ধি অসহনীয় হয়ে উঠেছে। পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে এবং এই সরকার চাকরির সংকট মোকাবেলায় অক্ষম। “২০১৪ সালে, একটি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ছিল ৪১০ টাকা, যা এখন ১,০৫০ টাকা৷ পেট্রোলের দাম ৭০ টাকা থেকে ১০০ টাকা এবং ডিজেলের দাম ৫৫ টাকা থেকে ৯০ টাকায় উঠেছে৷ ২০১৪ সালে (প্রতি লিটার) দুধের দাম ৩৫ টাকা ছিল এবং এখন ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে৷ সরিষার তেল (প্রতি লিটার) ৯০ টাকা থেকে ২০০ টাকা এবং (প্রতি কেজি) আটা ২২ টাকা থেকে ৪০ টাকায় লাফিয়ে উঠেছে।”

 এই জনসভার অন্যান্য বক্তাদের অধিকাংশই  ছিলেন বিভিন্ন  রাজ্যের  কংগ্রেস দলের সভাপতি, মুখ্যমন্ত্রী এবং দলীয় পদাধিকারী, যাঁরা সরকারকে অসংবেদনশীলতার জন্য অভিযুক্ত করেছেন। লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব এবং সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ নিয়ে প্রশ্নগুলির উত্তর দিতে প্রধানমন্ত্রীর অস্বীকার করাকে তাঁরা উল্লেখ করেছেন।

            প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে জনগণকে বোকা বানানোর এবং মিথ্যা প্রচারের মাধ্যমে নাগরিকদের বিভ্রান্ত করার অভিযোগ এনে তাঁরা দুঃখ প্রকাশ করেছেন যে সরকার এমনকি এই ভয়াবহ বাস্তবতা স্বীকার করতেও নারাজ।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published.