বিপ্লবী বীনা দাস

অপূর্ব সুন্দরী,নম্র ,ভদ্র,বিনয়ী, মিতভাষী,অন্তর্মুখী, অসমসাহসী, বীরাঙ্গনা ,অকুতোভয়,দেশের স্বাধীনতার জন্য যেকোনো মূল্য দিতে প্রস্তুত। তিনি বীণা দাস।

আজ ২৪শে আগস্ট তাঁর জন্মদিন।১৯১১ সালের এই দিনটাতে তিনি জন্মেছিলেন,যে বছরে মোহনবাগান বিলেতের গোরাদের ক্লাব ইষ্ট ইয়র্ক রেজিমপন্টকে হারিয়ে আইএফএ শিল্ড জিতে দেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে একটা প্রস্তরফলক রোপন করেছিল।বেণীমাধব দাস ও সরলা দাসের কন্যার দিদি- কল্যাণী দাসও ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী।

বীণা দাস নদীয়া জেলার কৃষ্ণনগরে জন্মগ্রহণ করেন। কিন্তু তাদের আদি বাড়ি ছিল চট্টগ্রাম।ততবার আদর্শে প্রভাবিত হয়ে রাজনীতিতে যোগ দেন। ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা সংগ্রামী জ্যোতিশ ভৌমিকের সাথে তাঁর বিয়ে হয়।

কলকাতায় তিনি বেথুন কলেজে পড়াশোনা ও স্নাতক ডিগ্রী অর্জন। ছাত্রাবস্থায় তার সাথে যুগান্তর দলের সম্পর্ক তৈরী হয়।১৯২৮ সালে সাইমন কমিশন বয়কট করার জন্য বেথুন কলেজের ছাত্রীদের নিয়ে প্রচার করেছিলেন। ১৯৩০ সালে ডালহৌসির অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের জন্য ছোট ছোট দলের নেতৃত্ব দেন এবং গ্রেপ্তার হন।

তারপর ব্রিটিশ বিরোধী সশস্ত্র বিপ্লবের নেতৃত্ব দিতে আরম্ভ করেন। ১৯৩২ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে বাংলার ব্রিটিশ গভর্নর স্ট্যানলি জ্যাকসনের উপর গুলি চালান।কিন্তু জ্যাকসন রক্ষা পেয়ে যান । বীণা দাস ধরা পড়েন। বিচারে তার ৯ বছর কারাবাস হয়।

১৯৪১ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত দক্ষিণ কলকাতার কংগ্রেসের সম্পাদিকা ছিলেন তিনি। ১৯৪৬ থেকে ১৯৫১ সাল পর্যন্ত তিনি পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার সদস্য ছিলেন।

নোয়াখালির দাঙ্গার পরে সেখানে তিনি ত্রাণের কাজ করতে গিয়েছিলেন। স্বাধীনতার পরেও সামাজিক ও রাজনৈতিক কাজে নিজেকে ব্যাপ্ত রাখেন। মরিচঝাঁপি গণহত্যার সময় তাঁর প্রতিবাদের কন্ঠ ধ্বনিত হয়েছিল।

বীণা দাসের শেষ জীবন বেদনাদায়ক ও মর্মান্তিক। স্বামীর মৃত্যুর পরে তিনি একপ্রকার সহায়সম্বলহীন হয়ে পড়েন।তার কারন তিনি শিক্ষকতার শেষে অবসরকালীন ভাতা পাননি ।স্বাধীনতার পর ডাক্তার বিধান চন্দ্র রায়ের অনুরোধে দক্ষিণ কলকাতার একটি নামকরা বিদ্যালয়ে তিনি শিক্ষকতার চাকরি পান।কিন্তু অবসরের সময় তিনি তাঁর শিক্ষাগতযোগ্যতার মার্কশিট ও শংসাপত্র দেখাতে পারেন নি। কারন প্রত্যেকেই জানেন যেদিন বীনা দাসের মার্কশিট ও শংসাপত্র পাওয়ার কথা এবং যিনি দেবেন ,সেই উপাচার্যকে উদ্দেশ্যে করেই গুলি চালিয়ে ছিলেন।সুতরাং তাঁর আর শংসাপত্র পাওয়া হয়ে ওঠেনি বাপাওয়ার কোনো প্রশ্নই ছিল না।ব্রিটিশ পুলিশের বাহিনী তাঁর বাড়িতে ঢুকে সমস্ত কাগজপত্রের সাথে কলেজের মার্কশিট ও কুচি কুচি করে ছিঁড়ে নর্দমার জলে ভাসিয়ে দিয়ে ছিল। তখন বীনা দাস কারাগারে বন্দী।

জেল থেকে বের হয়ে সক্রিয় কর্মী হিসেবে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসেযুক্ত হন এবং নেতৃত্ব দেন।যখন অবসর গ্রহণ করেন তখন সদ্য বামফ্রন্ট সরকার এসেছে ।জেলা শিক্ষা দপ্তরে,রাজ্য শিক্ষা দপ্তরের দরজায় দরজায় ঘুরেছেন।বহু মন্ত্রী আমলার কাছে ন্যায্য পাওনার জন্য বহু তদারক তদ্বির করেও পেনশন না পেয়ে হতাশ ও অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়েন ।তারপর ইতিহাসের পাতা থেকে হারিয়ে গেলেন বীনা দাস।

একদিন উত্তরাখণ্ডের একটি ইংরেজি পত্রিকায় একটি ঘটনা ও পাশের ছবিতে চোখ আটকে গেল ভারতবর্ষের প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী ওএকসময়ের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ডঃ ত্রিগুণা সেনের।সঙ্গে সঙ্গে তাঁর এক ছাত্রকে ফোন করলেন এবং হরিদ্বারের ঋষিকেশের একটি থানায় যেতে অনুরোধ করলেন।সাথে সাথে এটাও জানালেন তিনি কাছাকাছিই আছেন শীঘ্রই আসছেন বেওয়ারিশ লাশটি যেন সৎকার না করা হয়। ১৯৮৬ সালের ২৬শে ডিসেম্বর ঋষিকেশে সহায় সম্বলহীন এক অসহায়া মহিলার লাশ ভাসতে দেখা গেছিল গঙ্গার ধারে। ছুটে এলেন ত্রিগুণা সেন, ফুলের মালায়,চন্দনের ফোঁটায়, ধূপের ধোঁয়ায় এই মহাজীবনকে শেষ শ্রদ্ধা জানালেন ।

তাঁর সংগ্রামের উজ্জ্বল ধারাপাত স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে চিরকাল ।বীরাঙ্গনা বীনা দাসের মৃত্যু নেই ।

সনৎকুমার বটব্যাল

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published.