নব বাংলার রূপকার ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়

অমিতাভ সিনহা

১৯২৩ সালের পয়লা ডিসেম্বর সংবাদপত্রের প্রথম পৃষ্ঠার শিরোনামে একটা খবর দেখে বংলার মানুষ অবাক হয়ে গেলেন। দেশের অন্যতম বাগ্মী নেতা রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জীকে ব্যারাকপুর কেন্দ্রে পরাজিত করেছেন ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়। সুচিকিৎসক হিসাবে তখন তাঁর খ্যাতি বিস্তৃত হলেও, রাজনীতির জগতে তাঁর পরিচিতি রাষ্ট্রগুরুর কাছাকাছি ছিল না। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের স্বরাজ্য দলের সমর্থনে তার এই জয় সম্ভব হয়েছিল।১৮৮২ সালে বিধানচন্দ্রের জন্ম পাটনায়।পিতা প্রকাশচন্দ্র ও মাতা অঘোরকামিনী দেবীর পাঁচ সন্তানের কনিষ্ঠতম সন্তান ছিলেন বিধানচন্দ্র । আদি নিবাস টাকির ইছামতি নদীর ওপারে শ্রীপুর, বর্তমান বাংলাদেশের সাতক্ষীরা জেলা।পিতা ও মাতা দুজনেই ছিলেন ব্রাহ্ম ধর্মাবলম্বী ও কেশব চন্দ্র সেনের অনুগামী। তাঁরা স্ত্রীশিক্ষা প্রসার, জাতিভেদ প্ৰথার অবসান প্ৰভৃতি বিভিন্ন সমাজসেবা মুলক কাজের সঙ্গে জড়িয়ে ছিলেন। প্রকাশচন্দ্রের কর্মস্থল ছিল বিহারের পাটনা – বাঁকিপুর অঞ্চল।তিনি ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট পদমর্য্যাদার চাকুরি করলেও তাঁর নিজের বাড়ীতে অনেক অনাথ ছেলে থাকত যাদের তিনি নিজ সন্তানের স্নেহে বড় করেছিলেন।তাই বিধানচন্দ্রকে শৈশবে অনেক কষ্টের মধ্যে দিন কাটাতে হয়।বিএ পাশ করার পর মেডিক্যাল কলেজে ভর্ত্তির চিঠি আগে আসায় তিনি ইন্জিনিয়ারিং কলেজে ভর্তি না হয়ে ডাক্তারি পড়ার জন্য মনস্থির করেন। আর্থিকঅনটনের জন্য বই পর্যন্ত কিনতে পারতেন না তিনি।তা সত্বেও গভীর নিষ্ঠা তাঁকে করে তুলেছিল অনন্য। মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ কর্নেল লিউকিসের স্নেহ লাভ করলেও অধ্যাপক পেক তাঁকে মিথ্যা সাক্ষ্য দিতে বলায় ও বিধানচন্দ্র তা না করায় পেক তাঁকে একবার ফেল করিয়ে দেন। পরের বার অবশ্য পেক তাঁকে এলএমএস পরীক্ষায় পাশ করাতে বাধ্য হয়েছিলেন।বিলাতে গিয়ে একইসাথে এফআরসিএস ও এমআরসিপি এক সঙ্গে সম্পূর্ণ করেন যা বিরলতম ঘটনা।পরবর্তীকালে তিনি দেশের অন্যতম সেরা চিকিৎসক হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন । তাঁর চিকিৎসা থেকে বিখ্যাত নেতৃবৃন্দ থেকে অতি সাধারণ মানুষ কেউই বঞ্চিত হন নি।এমনকি মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীনও তিনি নিয়ম করে চিকিৎসা করে গিয়েছেন। প্রতিদিন ১০ জন পুরুষ রোগী ও ১৬ জন মহিলা রোগীকে বিনা পয়সায় চিকিৎসা করতেন। অনেক সময় তাদের ওষুধও কিনে দিতেন।প্রাইভেট প্র্যাকটিসের বিশাল রোজগার ছেড়ে ১৪০০ টাকা ভাতার মুখ্যমন্ত্রীত্ব নিয়েছিলেন বাংলাকে গড়বেন বলেই। এর ফলে যা দানধ্যান করতেন তা বজায় রাখতে সমস্ত জায়গা,জমি এমনকি সাধের শিলং এর বাড়ীটাও( রায়ভিলা) বিক্রি করে দিতে হয়েছিল।

তাঁর জীবনে অধ্যক্ষ লিউকিস ছাড়া বিশেষ প্রভাব ছিল দেশবন্ধু চিত্তরন্জন দাস ও মহাত্মা গান্ধির।বিধানচন্দ্র বলতেন আমার জীবন গঠনের মূলে আছেন এই তিনজন। দেশবন্ধুর মৃত্যুর পর স্বরাজ্য দলের উপনেতা নির্বাচিত হন। গান্ধিজির সমর্থনে চিত্তরন্জন সেবা সদন স্থাপন করেন।কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটিতে আসেন ১৯৩০ সালে এবং আজীবন সেই পদে থেকে দেশ তথা বাংলার উন্নয়নে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন যা তাঁর উত্তরসুরিরা তার একাংশও করতে পেরেছেন কিনা সন্দেহ আছে। ১৯৩১ সালে সুভাষচন্দ্রর প্রস্তাবে কলকাতা কর্পোরেশনে মেয়র। ১৯৪১ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, যুদ্ধের সময় দক্ষতার সাথে পরীক্ষা ও বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করেন তিনি। যাদবপুর ইন্জিনিয়ারিং কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনে তাঁর ভূমিকা অনস্বীকার্য। ১৯৩০ সালে আইন অমান্য আন্দোলনের জন্য আলিপুর সেন্ত্রাল জেলে আনা হল দিল্লী থেকে। দায়িত্ব নিলেন ১২০ শয্যার জেল হাসপাতালের।তার ফলে ছয়মাস মেয়াদী সাজার ছয়সপ্তাহ কারাবাস মকুবও হল।১৯৩৪ সালে বঙ্গীয় প্রদেশিক কংগ্রেস কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হলেন সুভাষচন্দ্রকে হারিয়ে। ১৯৪৬ সালে কলকাতায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা থামাতে ও শহরে শান্তি ফেরাতে সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করেন।১৯৪৭ সাল জওহরলাল তাঁকে সংযুক্ত প্রদেশের রাজ্যপালের দায়িত্ব নেওয়ার অনুরোধ জানান।কিন্তু তিনি তখন চিকিৎসার জন্য বিদেশে,তাই তাঁর রাজ্যপাল হওয়া হল না। কিন্তু মহাত্মাজির অনুরোধ মত তাঁকে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীত্ব নিতেই হল।১৯৪৮ সালের ২৩ জানুয়ারি নেতাজীর জন্মদিনে তিনি ড. প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষের স্থলাভিষিক্ত হলেন। তখন তাঁর বয়স ৬৫ বছর পেরিয়েছে। এইসময় তো সাধারণভাবে মানুষের অবসর নেওয়ার সময়।

কয়েকবছর আগে ১৯৪৩ সালের মন্বন্তরে বাংলায় মারা গেছেন ৫০ লক্ষ মানুষ। ৮৫ শতাংশ মানুষ দারিদ্রসীমার নীচে,স্বাক্ষরতার হার মাত্র ২০ শতাংশ, শিশুমৃত্যুর হার ১৫ শতাংশ। সদ্য স্বাধীন দেশ।দেশ ভাগ। উদ্বাস্তু সমস্যা। পূর্ববঙ্গের সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদাযের বিরাট সংখ্যক মানুষ পশ্চিমবঙ্গে চলে আসেন। বিরোধীরাও অনেক সময় গঠনমূলক রাজনীতি করেন নি। কিন্তু তিনি এই সমস্যাটিকে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে দেখেছিলেন। কেন্দ্রকে বোঝালেন এই দায় কেবল বাংলার নয়,সমগ্র দেশের।তাই সব রাজ্যকেই এই দায় ভাগ করে নিতে হবে।সেইমত বিভিন্ন রাজ্যে পশ্চিমবঙ্গের উদ্বাস্তুদের পূনর্বাসন করা হয়। কিন্তু পূর্ববাংলার উদ্বাস্তুরা মূলতঃ কৃষিজীবী হওয়ায় তারা পুনরায় পশ্চিমবঙ্গে ফিরে আসতে আরম্ভ করেন। তিনি আন্দামানে বেশ কিছু উদ্বাস্তু মানুষের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করেছিলেন।

১৯৫০ সালে ওপার বাংলায় দাঙ্গার ফলে আবার উদ্বাস্তু আগমন শুরু হয়।এপারেও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সূত্রপাত হয় যা বিধানচন্দ্র কঠোরভাবে দমন করেন।পরবর্তীকালে বিধানচন্দ্র পশ্চিমবঙ্গে উদ্বাস্তু পুনর্বাসনের সুষ্ঠু ব্যবস্থা করেন। তাদের মনোবল যাতে ভেঙে না পড়ে ও মানসিক অবসাদের শিকার যাতে তারা না হন তার জন্য মনোরঞ্জনের ব্যবস্থা করেন।জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র,হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, উৎপলা সেন,নাট্যকার মন্মথ রায় ,নেপাল নাগ ছিলেন এব্যাপারে তাঁর সহযোগী।গঠিত হয় লোকরঞ্জন শাখা‌।

দরিদ্র মানুষদের জন্য নিলেন ‘আপনার ঘর আপনি বানাও’ প্রকল্প। ১৯৫৬ সালে ভাগীরথীর তীরবর্তী অঞ্চলে ব্যাপক বন্যায় দরিদ্র মানুষদের ২লক্ষ কাঁচা বাড়ী ক্ষতিগ্রস্থ হয়। তৎক্ষনাৎ দুর্গতদের জন্য এই প্রকল্প রূপায়িত করেন।

কলকাতার খাটাল তুলে ১৯৪৯-৫০ সালে হরিনঘাটাতে চালু করলেন দুগ্ধ প্রকল্প। এর ফলে কলকাতায় দুগ্ধ সরবরাহ নিশ্চিত হল।১৯৬২ সালে বেলগাছিয়ায় দুগ্ধ কলোনী ও ডেয়ারি স্থাপন তাঁর অন্যতম কীর্তি। কলকাতার বিভিন্ন জায়গায় দুধের বুথ তৈরি করে মানুষের দ্বারে দ্বারে দুধ পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনাও তার সময় নেওয়া।দুঃখের কথা আজ সরকারী ঔদাসিন্যে তা বন্ধ। কলকাতায় জমা জলের হাত থেকে বাঁচাবার জন্য ২৩ হাজার একর জমি নিয়ে তৈরী হল সোনারপুর আর পাঁচমাতলা জলনিকাশী প্রকল্প। কলকাতার পূর্বদিকে লবনহ্রদের জমি উদ্ধার করে মধ্যবিত্ত বাঙালীদের থাকার জন্য তৈরী হল লবনহ্রদ শহরতলি, যা আজ বিধাননগর নামে পরিচিত। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে হুগলী নদীর পলিমাটি পাম্প করে জলাশয় বুজিয়ে এই শহরতলি গড়া হয়।এতে কলকাতার ওপর চাপ কমল।একই উদ্দেশ্যে নদীয়া জেলার কল্যানীতে আধুনিক উপনগরী গঠিত হয়। ১৯৫৯ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস অধিবেশনে ব্যবস্থা করা হল যাতে এই জায়গাটি পরিচিতি লাভ করে।পরে কল্যানীতে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও কল্যানী বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়।

বেকার যুবকদের চাকুরির সংস্থান করা ছিল তাঁর অন্যতম লক্ষ্য। স্টেট ট্রান্সপোর্ট কর্পোরেশন গড়ে তুলে চোদ্দ হাজার বেকারের চাকুরির ব্যবস্থা হল সেখানে। ১৯৫২ সালে কলকাতার কাছাকাছি একটি তৈল শোধনাগার স্থাপনের চিন্তা তিনি করেন। এতে তেল আনার খরচ যেমন কমবে তেমনি কলকাতায় গ্যাস সরবরাহ সহজে করা যাবে।একই সাথে বেশকিছু রাসায়নিক শিল্প কারখানাও গড়ে উঠবে।তাঁর ও সাংসদ সতীশচন্দ্র সামন্তর উদ্যোগে হুগলী ও হলদী নদীর মুখে হলদিয়া বন্দর ও হলদিয়া তৈল শোধনাগার স্থাপনের পরিকল্পনা করা হল।দ্রুত তা কার্যকর হলো।

গঙ্গার জলধারা পদ্মা দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় হুগলী নদীর নব্যতা নষ্ট হতে থাকে,তা বাড়াবার জন্যই হয় ফরাক্কা বাঁধ প্রকল্পের সূচনা। বীরভূম জেলায় ময়ুরাক্ষী প্রকল্পও তাঁর সৃষ্টি। কংসাবতী প্ৰকল্প তাঁর সৃষ্টি। অথচ সিদ্ধার্থ শংকর রায়ের আমলে নেওয়া তিস্তা প্রকল্প আজও শেষ হয় নি।দামোদর ভ্যালি প্রকল্পও তাঁরই প্রয়াস।ব্যান্ডেল তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রও তার আমলের একটা প্রয়জনীয় প্রকল্প।

১৯৪৯ সালে তাঁর প্রচেষ্টায় কেন্দ্রীয় সরকার ভারতের প্রথম রেল ইন্জিন কারখানাটি স্থাপন করলেন আসানসোলের কাছে সাঁওতালপল্লিতে। তাঁর রাজনৈতিক দীক্ষাগুরু চিত্তরন্জনের নামে এই কারখানা ও শিল্পনগরী চিহ্নিত হয়। কারখানাটি চিত্তরন্জন লোকোমোটিভ নামে পরিচিত। দুর্গাপুরে শিল্পনগরী করার ইচ্ছা তাঁর বহুদিন থেকেই ছিল কারণ রেলপথ,জলপথ ও জিটি রোডের দ্বারা জায়গাটি সংযুক্ত। তাছাড়া কয়লা খনিগুলিও কাছাকাছি।তাই এখানে কোক ওভেন কারখানা, বৈদ্যুতিক শক্তি উৎপাদন ও লৌহ ও ইস্পাত কারখানা গড়ে তুলে অর্থনৈতিক ও বেকার সমস্যা সমাধানের পথ ভাবলেন তিনি।তাই আজ দুর্গাপুর বাংলার অন্যতম বৃহৎ শিল্পনগরী।

টেক্সমাকো,ডানলপ,হিন্দুস্তান মোটর, ডিপিএল, জলঢাকা এরকম কত শিল্পের সাথে তাঁর নাম জড়িয়ে রয়েছে তার হিসাব কে রাখে।অশোকনগর,লবনহ্রদ,দুর্গাপুর,আসানসোল, কল্যানী তে মধ্যবিত্তদের জন্য উপনগরী।দেশের প্রথম আইআাইটি,অসংখ্য পলিটেকনিক, আইটিআই , ইঞ্জিনীরিং কলেজ , এগ্রিকালচার কলেজ গড়েছেন বাংলার ছাত্রদের শিক্ষা ও কর্মপোযোগী হিসাবে গড়ে তোলার লক্ষে। কিন্তু শিক্ষা ক্ষেত্রে কখনও দলীয় হস্তক্ষেপ করেননি। ফার্টিলাইজার কর্পোরেশন, রনজি স্টেডিয়াম, রবীন্দ্রসদন, মাউন্টেনিয়ারিং ইনস্টিটিউট তাঁরই স্বপ্নের ফসল। জাতীয় নাট্যশালার স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন যা আজও বাস্তবায়িত হল না।এছাড়াও আছে সিউড়ির উপকণ্ঠে তিলপাড়া ব্যারেজের সূচনা,কাঁথিতে লবন কারখানা,ট্রলারের সাহায্যে সমুদ্রে মাছ ধরার ব্যবস্থা।

লালগোলার রাজবাড়ী কিনে মানসিক হাসপাতাল, পি এন ঠাকুরের বাড়ী কিনে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়, বর্ধমান মহারাজার বাড়ী কিনে বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়, দিল্লীতে একটা বাড়ী কিনে বঙ্গভবন যা দিল্লীতে চিকিৎসা করতে যাওয়া মানুষের চাহিদা মেটায়।রাইটার্স বিল্ডিং এর ওপর চাপ কমাতে নিউ সেক্রেটারিয়েট বিল্ডিং তৈরী , বেলেঘাটায় বি সি রয় পলিক্লিনিক,রূপনারায়নপুরে কেবল ফ্যাক্টরি,কলকাতায় বিজ্ঞান কংগ্রেস ভবন,সেনেট হাউস ভেঙে বহুতল ভবন নির্মান,বস্তি উন্নয়ন,১৯৫৭ সালে হাওড়া শেওরাফুলি বৈদুতিক রেলপথ, রিষড়াতে প্লাস্টিক শিল্প ইম্পিরিয়াল কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রি স্থাপন। দণ্ডকারণ্য উন্নয়ন কতৃপক্ষ পুনর্গঠিত করলেন দেশের প্রথম নির্বাচন কমিশনার সুকুমার সেনকে চেয়ারম্যান করে।বৃহত্তর কলকাতা উন্নয়ন, জলনিকাশী, পয়োপ্রণালী উন্নতিকরণ, অশোকনগর ও কল্যানীতে সুতাকল,পুরুলিয়ায় রামকৃষ্ণ মিশন স্থাপনের উদ্যোগ,নর্থবেঙ্গল ইউনিভারসিটি, বাঁকুড়ায় সম্মিলনী মেডিক্যাল কলেজ স্থাপন সবই তাঁর দূরদর্শীতার ফসল। ভ্রমনপিপাসুদের জন্য তাঁর অবদান দীঘার সৈকতাবাস।এর ফলে একটা বড় এলাকা আজ পর্যটনকেন্দ্র হিসাবে তৈরী হয়েছে।মন্দারমনি,শংকরপুর,তাজপুর সৃষ্টি হয়েছে দীঘার জন্ম হয়েছিল বলেই। বক্রেশ্বরের উষ্ণপ্রস্রবনটিও আকর্ষনীয় করার পরিকল্পনা তাঁর ছিল।

তাঁর চরিত্রের একটা বড় গুণ ছিল কখনও কোন কাজ ফেলে রাখতেন না।কখনও বিরোধী দলের কারও সাথে নিজ দলের কাউকে আলাদা করে দেখতেন না।বিধানসভায় জ্যোতি বসু তীব্র ভাষায় আক্রমণ করতেন তাঁকে,কিন্তু তিনি চিরদিনই তার প্রতি স্নেহশীল ছিলেন। যে যতীন চক্রবর্তী বিধান পরিষদে বিধানচন্দ্রের মুণ্ডপাত করতেন,বিধানচন্দ্র জেনিভাতে আইএলও’র অধিবেশনে ভারতের প্রতিনিধি হিসাবে সেই যতীনবাবুর নাম সুপারিশ করেছিলেন।সকলের সাথে তাঁর ব্যবহার ছিল অত্যন্ত সহৃদয়। ফাইলে কোন অফিসার বা মন্ত্রী বিরুদ্ধ মত পোষণ করলে যদি তা যুক্তি দিয়ে তাঁকে বোঝাতে পারতেন তাহলে তা মেনে নিতেন।ফাইল তিনি আদ্যপ্রান্ত পড়তেন।সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায় অফিসারদের ওপর চাপিয়ে দিতেন না।তাদের বিশ্বাস করতেন বলেই অফিসাররা তাঁকে মন খুলে তাদের বক্তব্য জানাতে পারতেন।খাওয়া দাওয়াতে তিনি মিতব্যয়ী ছিলেন।কোন বিলাসীতা ছিল না তাঁর জীবনযাপনে।ছাত্রদের খুব ভালবাসতেন।তাদের জন্যে ব্যক্তিগত উদ্যোগে তিনি নীরবে অনেক কিছু করতেন। যেমন কলেজ স্ট্রিটের একটা বইয়ের দোকানে তাঁর হাতে লেখা চিরকুট নিয়ে গেলেই ছাত্ররা বিনামূল্যে বই পেতেন।পরে দোকানের মালিক বিধানচন্দ্রর কাছ থেকে বইয়ের দাম নিয়ে যেতেন।

ডা. বিধানচন্দ্র রায় ছিলেন ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলার নব জাগরণের সার্থক উত্তরসূরি। স্বাধীনতা সংগ্রামী বিধানচন্দ্র ছিলেন তাঁর সময় দেশের ও বিদেশের খ্যাতনামা চিকিৎসক।তিনি শুধুমাত্র একজন কর্মযোগীই ছিলেন না, ছিলেন একজন স্থিতপ্রজ্ঞ পুরুষ। তাঁর জন্ম ও প্রয়াণ দিবসে তাঁকে জানাই ভক্তিপূর্ন প্রণাম।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published.