সম্পাদকীয় । কংগ্রেসের বার্তা – বিধান রায়ের বাংলা

দীপ্তিমান ঘোষ

পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনী মরশুম। পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশ কংগ্রেস কমিটির ইস্তেহার প্রকাশ পেল। এমতাবস্থায় বিধানচন্দ্র রায়কে নিয়ে লেখা আমার কর্তব্য বলে মনে হল। সময়ের ব্যবধানে আধুনিক বাংলা গড়ার পেছনে বিধান রায়ের যে অভূতপূর্ব অবদান — তা আমরা ভুলতে বসেছি।

স্বাধীনতার পর পশ্চিমবঙ্গের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী হন ডঃ প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষ। তাঁর মুখ্যমন্ত্রীত্ব স্থায়ী হয়েছিল মাত্র কয়েক মাস। ডঃ ঘোষের রাজনৈতিক এলাকা ছিল পূর্ববঙ্গ। হুগলী ও মেদিনীপুরে কংগ্রেস নেতা অতুল্য ঘোষ  ও প্রফুল্লচন্দ্র সেনের সাথে ডঃ ঘোষের মনোমালিন্য হল, তিনি অচিরেই দল ছেড়ে দিলেন। ১৯৬৭-তে একবার অল্প সময়ের জন্য আবার তিনি রাজনীতির পাকেচক্রে ১৯৬৭-৬৮ তে ডঃ ঘোষ অল্প কয়েক মাসের জন্য আবার পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হন। তাঁর দল বাংলা কংগ্রেসকে তখন সমর্থন জানিয়েছিল কংগ্রেস।  

ফিরে আসি ডঃ বিধানচন্দ্র রায়ের কথায়। ডঃ রায় ১৯৪৮-এর রাজনৈতিক ঘনঘটার মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর গুরুদায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। ১৯৪৩ থেকে বাংলায় একের পর এক দুর্যোগের ঘনঘটা। ১৯৪৩ সাল বাংলার ইতিহাসে পঞ্চাশের মন্বন্তর নামে পরিচিত। ব্রিটেনের তখনকার প্রধানমন্ত্রী ইউন্সটন চার্চিল তাঁর অমানবিক ওঁ স্বৈরাচারী সিদ্ধান্তের ফলে বাংলাকে এক মানুষের তৈরি দুর্ভিক্ষের সম্মুখীন হতে হল। সুচতুর চার্চিল বাংলাতে গড়ে ওঠা নেতাজী সুভাষচন্দ্র বোসের বিদ্রোহ বা অনুশীলন সমিতির বৈপ্লবিক কার্যকলাপ এসবকে ভেঙে দিতে চাইছিলেন। পাঠকের অবগতির জন্য জানাই সেদিনের অনুশীলন সমিতির আজকের নাম রেভ্যুলিউশানারি পার্টি যার আজকের নাম আর এস পি। ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষ যে মানুষেরই তৈরি সেটা বিষদে দেখিয়েছেন নোবেল জয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন।

সেই ভয়াল দুর্ভিক্ষের পর, ১৯৪৭-এ এল স্বাধীনতা ও দেশভাগ।  যখন সারা ভারত স্বাধীনতা পাওয়ার আনন্দে উৎসবে মাতোয়ারা তখন বাংলার উপরে দেশভাগের কালো ছায়া; কলকাতাসহ বাংলার বহু জায়গায় ১৯৪৬ ও ১৯৪৭-এর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় আজও আমরা মানসিকভাবে ক্ষত-বিক্ষত। সেদিনের সেই ভ্রাতৃঘাতী রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা; ভাবতে অবাক লাগে যারা গতকাল অবধি একে অপরের প্রতিবেশী ছিল তারাই এই দাঙ্গায় একে অপরের সাথে সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে। যারা এই মর্মান্তিক দাঙ্গা দেখেছেন একমাত্র তারাই অনুভব করতে পেরেছেন এর বিশালতা। গান্ধীজী সেই সময় কলকাতাকে নিজের বাসস্থান করে ফেলেন। তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে গান্ধী বহুবার অনশন করেছেন। কিন্তু স্বাধীনতা দেশভাগের ওই সময়তেই মহাত্মা তাঁর জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ সময় জুড়ে অনশন করেন। তাঁর অনমনীয় দৃঢ়তায় অবশেষে শান্তি ফিরেছিল বাংলায়।

তৃতীয় যে ঘটনাটি পশ্চিম বাংলাকে বিধ্বস্ত করে দিয়েছিল, তা হল দেশভাগের পর পূর্ব পাকিস্তান থেকে আসা উদ্বাস্তু মানুষের স্রোত। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আসা হিন্দু উদ্বাস্তুরা ছিলেন অর্থনৈতিক দিক থেকে অনেকটাই দুর্বল।

ডঃ রায় যখন ১৯৪৮ সালের গোড়ায় পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর ভার নিলেন, এই ছিল তখনকার অবস্থা। আমি এটা বলতে বাধ্য যে অতুল্য ঘোষ ও প্রফুল্লচন্দ্র সেন তাঁদের ডঃ রায়কে মুখ্যমন্ত্রী পদে নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত, তাঁদের রাজনৈতিক বিচক্ষনতার প্রমাণ। তারা জানতেন যে নিজের ডাক্তারি পেশার বাইরেও ডঃ বিধানচন্দ্র রায়ের যোগ্যতা ছিল অতুলনীয়।

১৯৪৮-১৯৬২ ডঃ রায়ের মুখ্যমন্ত্রীত্বে এই চোদ্দটি বছর আধুনিক পশ্চিমবঙ্গের স্বর্ণযুগ। দার্জিলিং থেকে বঙ্গোপসাগর, পশ্চিমবঙ্গের মানচিত্রটি দেখুন; দেখবেন প্রত্যেক স্তরে ডঃ রায়ের কাজের ছাপ রয়েছে। তাঁর কাজের তালিকা দীর্ঘ কিন্তু আমি স্মৃতি থেকে শুধু কয়েকটা তুলে ধরছি। ডঃ রায় বুঝেছিলেন দেশের অর্থনৈতিক উৎপাদনের মাত্র ১৫ শতাংশ আসে কৃষি ক্ষেত্র থেকে। সেজন্য রাজ্যের উন্নয়নের জন্য তিনি সর্বশক্তি নিয়ে শিল্পায়নের পথে ঝাঁপিয়ে ছিলেন ও সেটা সরকারি ক্ষেত্রে এবং বেসরকারি শিল্পের ক্ষেত্রেও। একদিকে সরকারি প্রতিষ্ঠান দুর্গাপুর স্টিল প্ল্যান্ট, অন্যদিকে ব্যক্তি মালিকানায় ইন্ডিয়ান আয়রন অ্যান্ড  স্টিল কোম্পানি; এভাবেই তৈরি হল দুর্গাপুর, আসানসোল শিল্পাঞ্চলের মূল ভিত্তি। এবং এই অঞ্চলের কয়লা শিল্পও উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেল। জনসংখ্যা যাতে এক জায়গাতে আবদ্ধ না থাকে, কলকাতা শহরের ওপরে চাপ যাতে লাগাম ছাড়া না হয়ে যায় সেজন্য ডঃ রায় বিভিন্ন স্যাটেলাইট শহরে নগর পরিকল্পনা করেছিলেন। তারই অন্যতম কল্যাণী শহর।

কলকাতা থেকে হুগলী নদী পেরোলেই শহর হাওড়া। হাওড়া হয়ে উঠেছিল কারিগরি শিল্পে এক ভারত বিখ্যাত প্রাণকেন্দ্র। জার্মানির রুহ্‌ঢ় শিল্পাঞ্চলের সাথে তুলনীয়। মনে রাখতে হবে ডঃ রায়কে কাজ করতে হয়েছে তদানীন্তন ভারতের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সরকারি ঘেরাটোপের মধ্যে।

কিন্তু তাঁর সময়তেই বাংলায় গড়ে উঠেছিল সব থেকে বড় গাড়ির কারখানা, উত্তরপাড়ায় অবস্থিত হিন্দুস্তান মোটরস। ভাবলে অবাক হতে হয় সেদিনের সেই কারখানা এমন সফল যে সেখানে রেল স্টেশনও তৈরি হয়েছিল, যার নাম মুখে মুখে আজও ফেরে — হিন্দ মোটরস। বাংলার বস্ত্র শিল্পও দারুণভাবে এগিয়ে চলেছিল অন্নপূর্ণা কটন মিল, মোহিনী মিলস, গোপাল হোসিয়ারি ইত্যাদি। সফল শিল্পের কোম্পানির তালিকাটাই ২-৪ পাতা ছাড়িয়ে যায়। কয়েকটার নাম না করে পারছি না। কৃষ্ণা গ্লাস ও সিলিকেট, সুলেখা ইঙ্ক, অ্যালিয়েড কেমিক্যালস ও রেইসিন্স, ন্যাশনাল রবার, ইনচেক টায়ারস, সেন রেলিঘ সাইকেল, হিমালয় পেপার এবং বোর্ড মিল ইত্যাদি। এই প্রতিষ্ঠানগুলি প্রত্যেকটাই তৈরি করেছিলেন বাঙালি ব্যবসায়ীরা আর তাঁদের প্রেরণা জুগিয়েছিলেন ডঃ রায়।

আজ এই ২০২১-এ বাঙালির এক সর্বকালের প্রিয় আইকন, সত্যজিত রায়ের জন্ম শতবর্ষ পালিত হচ্ছে। যে চলচিত্রের জন্য সত্যজিত রায়ের প্রথম বিশ্বজোড়া খ্যাতি সেই পথের পাঁচালি তৈরির জন্যেও অর্থের অনুদান জুগিয়েছিলেন ডঃ রায়। সেজন্য বলতে চাই শুধু অর্থনীতিতে নয় বাঙালির সংস্কৃতির প্রাঙ্গণেও ডঃ বিধান রায়ের অবদান চিরস্মরণীয়।

এবার আসি তাঁর অন্য কীর্তির কথায়। তেনজিং নোরগের এভারেস্ট জয়ের পর দার্জিলিঙে হিমালয়ান মাউনটেনারিং ইন্সটিটিউট, উত্তরবঙ্গে এগ্রিকালচারাল ইউনিভার্সিটি, খড়গপুর আই আই টি, কল্যাণী ইউনিভার্সিটি, সল্টলেক শহরের ধারণা অর্থাৎ আজকের বিধাননগর, সি রিসর্ট রুপে দিঘা ইত্যাদি। এছাড়াও ডঃ রায় কলকাতার জন্য চক্র রেল ও মেট্রো রেলের ধারণা দেন। ১৯৬৭ সালে রাজ্য রেল মন্ত্রী পরিমল ঘোষ চক্র রেল ও মেট্রো রেল অনুমোদনে সক্ষম হন। যা বাংলার জন্য দারুণ ব্যাপার। আশির দশকে গণি খান চৌধুরী দুটি রেলেরই প্রথম ট্রেনটির শুভ সূচনা করেছিলেন।

দেশভাগের পরে ডঃ রায় দিল্লীতে বাঙালি উদ্বাস্তু কলোনি গড়ে তোলার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে তদবির করেছিলেন। ১৯৬১ সালে তদানীন্তন কেন্দ্রীয় আবাসন মন্ত্রী মেহের চাঁদ খান্না এই প্রকল্পে রাজিও হয়েছিলেন। এই প্রকল্পের জমিটা পাওয়া যায় ১৯৬৬তে দিল্লীর গ্রেটার কৈলাসের কাছে। ততদিনে ডঃ রায় মারা গেছেন। সেই সময় কলোনির নাম ছিল ই পি ডি পি (ইস্ট পাকিস্তান ডিসপ্লেসড পারসন্স কলোনি)। এখন সেই পাড়াটার নাম চিত্তরঞ্জন পার্ক।

ডঃ রায়ের সম্বন্ধে লিখতে গেলে একটা গোটা বই হয়ে যাবে। আমি শ্রী অধীর রঞ্জন চৌধুরীকে সাধুবাদ দেব যে ২০২১-এ কংগ্রেসের নির্বাচনী ইস্তেহারে তিনি বিধানচন্দ্র রায়ের উন্নয়ন ভাবনাকে তুলে ধরেছেন। স্বাধীনতা পরবর্তী পশ্চিমবঙ্গ কংগ্রেসের স্বর্ণযুগ ছিল ১৯৪৮ থেকে ১৯৬৭; সেটা ছিল বিধানচন্দ্র রায় ও প্রফুল্লচন্দ্র সেনের সময়। তারপর অনেকগুলো বছর আমাদের কাছে হারানো সময়। এবার ২০২১-এ আমরা আবার বিধান রায়ের দেখান পথে পশ্চিমবঙ্গকে আরেকবার স্বর্ণযুগ উপহার দিতে চাই। অধীর চৌধুরী যেমন বলেছেন, ‘আমরা পারব। আমরা করে দেখাব।’   

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published.