শিল্পে পশ্চিমবঙ্গর অবনমন এবং আমাদের দায়বদ্ধতা

মানস ব্যানার্জী

ঐতিহাসিকভাবে পশ্চিমবঙ্গের হাওড়া, হুগলি, দুই ২৪ পরগনা ও কলকাতার শিল্প ১৮ শতকের গোড়ার দিকে নদীকেন্দ্রীয় বাণিজ্যে সমৃদ্ধ হয়েছিল। রেলওয়ে এবং কলকাতা বন্দরের আবির্ভাবের সাথে সাথে লৌহ, প্রকৌশল এবং উৎপাদন শিল্প তার শিকড় গেড়েছিল। পাট শিল্প, রাসায়নিক শিল্প, টেক্সটাইল শিল্প, অটো পার্টস উৎপাদন শিল্প, ইস্পাত এবং লোহার সরঞ্জাম শিল্প দ্বারা সমৃদ্ধ হয়েছিল গঙ্গা নদীর সন্নিহিত অঞ্চলগুলি‌ যার মধ্যে অন্যতম অঞ্চল হিসেবে হাওড়া “ভারতের শেফিল্ড” হিসাবে পরিচিত ও সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে।
স্বাধীনতার পর, বিশেষ করে বামেদের আমলে বেসরকারি উদ্যোগের প্রতি সরকারের অবহেলা, অত্যধিক শুল্ক, কলকাতা বন্দরের নাব্যতা হ্রাস, হলদিয়া বন্দরের পতন এবং ব্যাপক বাম জঙ্গি ট্রেড ইউনিয়নবাদ হাওড়া সহ গঙ্গা তীরবর্তী অঞ্চলের শিল্প সম্ভাবনাকে ধ্বংস করে দেয়। অসুস্থ শিল্প ও বেকারত্ব ব্যাপক আকার ধারণ করে এবং এর ফলে সামাজিক ও আইনশৃঙ্খলা সমস্যার সৃষ্টি হয়।
• গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গ কেন শিল্পে সমৃদ্ধ হয়েছিল?
ভাল সংযোগ: নদী পরিবহন দ্বারা যুক্ত যথার্থ রেল ও সড়ক যোগাযোগ হাওড়া সহ গঙ্গা তীরবর্তী অঞ্চলকে শিল্পের জন্য একটি পছন্দের পছন্দ করে তুলেছিল।
গ্রামীণ পশ্চিমাঞ্চল: বর্ধমান, হুগলি এবং হাওড়ার কৃষিক্ষেত্রগুলি হাওড়ায় শিল্প বিকাশের জন্য ব্যবহৃত হত। উপলব্ধ বাজার ছিল সমগ্র উত্তর, মধ্য এবং পূর্ব ভারতসহ সমগ্র এশিয়া হয়ে বিশ্ববিস্তৃত।
প্রধান বন্দর: হুগলি বন্দর ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের একটি প্রধান কেন্দ্র। নেপাল, ভুটান এবং বাংলাদেশের মতো অন্যান্য দেশের জন্য বন্দরটি ছিল একমাত্র উপলব্ধ নৌ-পরিবহন সংযোগ।
সস্তা শ্রম: গাঙ্গেয় বেল্টে বড় গ্রামীণ অন্তঃস্থল এবং অত্যধিক জনসংখ্যার কারণে সস্তায় উপলব্ধ দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিক প্রচুর ছিল।
ক্রেডিট এবং বীমার প্রাপ্যতা: কলকাতা ছিল ব্যাঙ্ক এবং বীমা সংস্থাগুলির শহর। ইউরোপীয় আর্থিক স্বার্থ কলকাতাকে বৈশ্বিক অর্থের বৃহত্তম এশীয় কেন্দ্রে পরিণত করেছিল। উপলব্ধ ঋণ এবং নিরাপত্তা কলকাতা ভিত্তিক জেলায় শিল্পকে উন্নতি করতে সাহায্য করেছে।
• বর্তমান অবস্থা কি?
ভুল সরকারি নীতি ও উগ্ৰ ট্রেড-ইউনিয়ানবাদ:বাম আমলে শ্রমিকদের বাঁচানোর নামে তাদের একত্রিত করে মালিকপক্ষের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেওয়া হতো। ন্যূনতম মুনাফা না আসায় একে একে বড় বড় কলকারখানা বন্ধ হয়ে যায়। “মালিক বাঁচলে শ্রমিকও বাঁচবে” এই আপ্তবাক্য ভুলে পরিকল্পিত ভাবে তৈরি করা শ্রমিক অসন্তোষ, সেকেলে শিল্প, অনুদানপ্রাপ্ত প্রকল্প বেসরকারি শিল্পগুলোকে অসুস্থ করে দেয়। অনেক বড়-শিল্প অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং কেন্দ্রীয় সরকারের বিএফআইআর তহবিল দ্বারা লাইফলাইনে চলে যায়। নতুন তহবিল স্থাপন এবং শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করার মতো আসল সমস্যার সমাধান হয়নি। বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর, তারা ইতিমধ্যে BFIR তহবিল বন্ধ করে দিয়েছে এবং শুধু বড় শিল্পই নয় কেন্দ্রীয় সরকারি ও রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলোকেও বিক্রি করছে ও করার চেষ্টা করছে।
জুট ও কটন মিলের সমস্যা: বাম আমল থেকেই হাওড়া, হুগলি, দুই ২৪ পরগনায়‌ বিস্তৃত জুট ও কটন মিলগুলো একে একে বন্ধ হয়েছে কিংবা ধুঁকছে। আশ্চর্যজনক ভাবে, যখন কিনা জুট ও কটনের চাহিদা সারা বিশ্বব্যাপী তুঙ্গে। বর্তমানে এই বাজার ধরে নিচ্ছে আমাদেরই প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশ। পশ্চিমবঙ্গে ব্যবসাকারী মিল মালিকরা এখানে মিলগুলো একে একে বন্ধ করে বা বছরে চার-পাঁচ মাস খুলে রেখে পুরো লগ্নিটাই করছেন বাংলাদেশে। বর্তমান তৃণমূল সরকারও পড়ে থাকা জমিতে নতুন শিল্প চালু না করে সেখানে রিয়াল এস্টেট বানাতেই বেশি মনোযোগী। মিল মালিকরা লক্ষ লক্ষ শ্রমিকদের EPFO খাতায় নিজেদের ভাগের টাকা দেননি। বকেয়া EPF-এ পশ্চিমবঙ্গ দেশের শীর্ষে। অর্থাৎ, একদিকে বামেরা শ্রমিকদের বাঁচানোর নামে মালিকদের একতরফা শোষণ করতে গিয়ে একে একে বড় বড় কলকারখানা বন্ধ করিয়েছেন আর অন্যদিকে তৃণমূল সেই পতিত জমিতে নতুন নতুন রিয়াল এস্টেট বানাতেই ব্যস্ত রয়েছেন। এটা না বুঝেই যে এই জাতীয় শিল্পের বেঁচে থাকা প্রকৃত শিল্পের অর্থাৎ উৎপাদন শিল্পের টিকে থাকার উপর নির্ভর করে। একটি উদাহরণ হল মধ্য হাওড়ার “নবান্ন” ভবন যা বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সদর দপ্তর হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ওই ভবনের আসল উদ্দেশ্য ছিল একটি টেক্সটাইল ম্যানুফ্যাকচারিং হাব, যেভাবে বাংলাদেশিরা ঢাকা ও চট্টগ্রামে তৈরি করেছে।
• আমাদের প্রস্তাব :
শিল্প, শুধু টাউনশিপ নয়: পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সমস্ত পরিকল্পনা টাউনশিপ তৈরিতে শেষ হয় এবং শাসক দলের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কযুক্ত ল্যান্ড হাঙ্গরদের সস্তা জমি প্রদান করে। কিন্তু হাওড়া, উলুবেড়িয়া সহ গঙ্গা তীরবর্তী অন্যান্য জেলায় প্রচুর শিল্প জমি পাওয়া যায় যা সঠিকভাবে ব্যবহার করা হয় না। অনেক শিল্প-কারখানা বন্ধ, যাদের জমি ব্যবহার করা যায়।
আলামোহন দাসের নামে ইন্ডাস্ট্রিয়াল হাব: সুরেন্দ্র মোহন দাস, যিনি আলামোহন দাস নামে পরিচিত, হাওড়ার একজন অগ্রগামী শিল্পপতি ছিলেন যিনি হাওড়ায় অসংখ্য শিল্প ইউনিট গড়ে তুলতে সাহায্য করেছিলেন। যারমধ্যে, আরতি কটন মিল, ভারত জুট মিল অন্যতম। তিনি দাসনগরে ১০০ একর জমিতে ইন্ডিয়ান মেশিনারি কোম্পানির স্রষ্ঠা, যা আজ পতিত অবস্থায় কিংবা এলাকার বেশ কিছু রাজনৈতিক নেতা সহ অন্যান্য বেআইনি দখলদারদের কবলে। আমরা চাই মহান স্বপ্নদ্রষ্টা এবং “স্বদেশী আন্দোলনের” অগ্রদূত শ্রী আলামোহন দাসের অবদানকে স্মরণ করার জন্য তাঁর নামে দাশনগরের জমিতে পশ্চিমবঙ্গ সরকার শিল্প কেন্দ্র গড়ে তুলুক। মুম্বাই শহরে বান্দ্রা-কুরলা ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্সের মতো হওয়া উচিত। টেক্সটাইল, নরম খেলনা, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, ইলেক্ট্রোমেকানিকাল সরঞ্জামগুলির মতো বিভিন্ন শিল্পকে কেন্দ্র করে এলাকাটিকে অবশ্যই বিভিন্ন শিল্প কেন্দ্রে বিভক্ত করতে হবে। এটি অবশ্যই একটি আধুনিক শিল্প কেন্দ্র হতে হবে যাতে হাই রাইজ ইন্ডাস্ট্রিয়াল বিল্ডিং, ফুড কোর্ট, ব্যাঙ্ক, পিএফ অফিস, ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্রোডাক্ট রিসার্চ এবং ট্রেনিং ইনস্টিটিউট ইত্যাদি থাকবে।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, আইএনটিইউসি স্বীকৃত আরতি কটন মিলস্ এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন ও ইন্ডিয়া মেশিনারী এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন বেশ কয়েক বছর ধরে বর্তমানে ভারত সরকারের NTCL-এর অধীনস্থ আরতি কটন মিলে উৎপাদন শুরু করে শ্রমিকদের পুরো মাইনে‌ প্রদানের দাবিতে ও ইন্ডিয়া মেশিনারীর অসহায় শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা মিটিয়ে জমিকে বেআইনি দখলদারদের হাত থেকে মুক্ত করে ঐ জমিতে শিল্প-হাব গড়ে তুলতে সমস্তরকমভাবে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।
ফোকাস শিল্প: বৈদ্যুতিক এবং ইলেকট্রনিক্স সরঞ্জাম, সৌর শক্তি পণ্য, টেলিকম সরঞ্জাম, পাট ও সুতী ভিত্তিক পণ্য, নরম খেলনা, ছোট এবং উচ্চ নির্ভুল মেশিনারিজ, আইটি হার্ডওয়্যার পণ্যগুলিতে ফোকাস সহ টেক্সটাইল হাব।
দেশের শীর্ষস্থানীয় শ্রমিক সংগঠন হিসেবে ইন্টাক (INTUC)-এর দুটি মৌলিক ফোকাস রয়েছে: 1) প্রতিষ্ঠান উন্নয়ন 2) কর্মসংস্থান সৃষ্টি। ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন গঠন করতে হবে। আইআইটি খড়গপুর, আইআইইএসটি শিবপুর এবং বিভিন্ন আইটিআই গুলিকে পণ্যের নকশা এবং বিকাশে সহায়তার জন্য মুক্ত করতে হবে। একটি সমন্বিত সমন্বয় গড়ে তুলতে হবে।
(লেখক, রাজ্য কোঅর্ডিনেটর- আইএনটিইউসি পশ্চিমবঙ্গ শাখা।)

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published.