গান্ধীবাদী দৃষ্টিভঙ্গীতে মে’দিবস

মানস ব্যানার্জী

( কোঅর্ডিনেটর, রাজ্য INTUC)

মে দিবস আসে যায়… শ্রমিকের কান্না বেড়েই যায়!

যদিও শ্রমিক আন্দোলনের উৎপত্তি ১৮৬০ -এর দশকে পাওয়া যায়, ভারতের ইতিহাসে প্রথম শ্রমিক আন্দোলন কিন্তু ১৮৭৫ সালে বোম্বেতে ঘটেছিল। এটি এস এস বেঙ্গালির নেতৃত্বে সংগঠিত হয়েছিল। এটি শ্রমিকদের, বিশেষ করে নারী এবং শিশুদের দুর্দশার দিকে মনোনিবেশ করেছিল।

আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের সাফল্য যাঁরা ব্রিটিশ সরকারকে ভারতীয় শ্রমিকদের বৈধ স্বার্থে নিম্নোক্ত আইনগুলি প্রতিষ্ঠার জন্য মাথা নত করিয়েছিলেন…


1) শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ আইন, ১৯২৩

2) ভারতীয় ট্রেড ইউনিয়ন আইন, ১৯২৬

3) বাণিজ্য বিরোধ আইন, ১৯২৯

4) শিল্প কর্মসংস্থান আইন, ১৯৪৬

5) মজুরি পরিশোধ আইন, ১৯৩৬

6) সাপ্তাহিক ছুটির আইন, ১৯৪২

7) শিল্প বিরোধ আইন, ১৯৪৭

8) কারখানা আইন

9) কর্মচারী রাজ্য বীমা আইন

10) ন্যূনতম মজুরি আইন


ট্রেড ইউনিয়নবাদের গান্ধীবাদী দৃষ্টিভঙ্গি হলো “শ্রেণী সংঘাত ও সংগ্রামের পরিবর্তে শ্রেণী সহযোগিতা” ভিত্তিক। শ্রমিকদের মধ্যে সংস্কার এবং আত্মসচেতনতার মাধ্যমে পুঁজিবাদীর কাছ থেকে শ্রমিকের যথাযথ অংশ নেওয়ার ধারণাটি ট্রেড ইউনিয়নবাদের উত্থান ঘটায়।

গান্ধীর মতে, দার্শনিক থেকে সাধারণ শ্রমিক পর্যন্ত প্রত্যেককেই ন্যূনতম শারীরিক শ্রম করতে হবে।
সকলের দ্বারা রুটির জন্য শ্রমের বাধ্যবাধকতা, গান্ধীর দৃষ্টিতে পুঁজি এবং শ্রমের মধ্যে বিরোধ মুছে দেবে এবং ধনীরা নিজেদের সম্পত্তির শুধুমাত্র ট্রাস্টি মনে করবে।

তিনি প্রচার করেছিলেন যে ট্রেড ইউনিয়নগুলি এমন একটি নৈতিক প্রতিষ্ঠান হওয়া উচিত যেখানে একজন শ্রমিক তাদের আচরণ উন্নত করতে পারে, তাদের মর্যাদা সমুন্নত রাখতে পারে, ট্রাস্টিশিপের আদর্শ অনুসরণ করতে পারে এবং সমতা ও সমতার নীতিগুলিও অনুসরণ করতে পারে।

স্বাধীনতার পর জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃত্বে দেশ জুড়ে শিল্প ও কৃষিক্ষেত্রে লাগাতার বিনিয়োগ, বিপুল জোয়ার, অগ্ৰগতি ও আয় থেকেই ক্রমে ক্রমে দেশ প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে বিশ্বের দরবারে নজরকাড়া স্থান দখল করতে সক্ষম হয়। একে একে আম আদমির জন্য খাদ্য সুরক্ষা, সামাজিক সুরক্ষা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বলিয়ান হয়ে ওঠে প্রতিটি ভারতীয়। ইন্দিরা গান্ধীর উদাত্ত আহবান “গরিবী হটাও” শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার সুনিশ্চিত করতে ম্যাজিকের মতো কাজ করে। একে একে প্রনীত হয় আরও ৪০ টি শ্রমিক আইন।

হঠাৎ উদয় হয়  তথাকথিত  বামপন্থীদের। এই শ্রমিকদের ভুল পথে চালিত করে তারাই। মালিকদের শোষণ করলেই শ্রমিকদের আসল লাভ – এই ভ্রান্ত মতবাদের বলী হয় কোটি কোটি শ্রমিক। বন্ধ হতে থাকে লক্ষ লক্ষ কলকারখানা। এব্যাপারে দেশের মধ্যে সবচেয়ে এগিয়ে ছিল পশ্চিমবঙ্গ। ৩৪ বছরে শিল্পকে দুমড়েমুচড়ে শ্মশানে পরিণত হয় বাংলা।

পালাবদলে যারা এলো, তাদের স্লোগান ছিল…শিল্পের জমিতে শিল্প চাই। শিল্প হলো। শিল্পের জমিতে বহুতল বানানোর শিল্প। মূল জায়গা থেকে সরে যেতে যেতে সরকারের আয় আজ প্রায় নেই বললেই চলে। ফলে ধার করে সংসার চালাচ্ছে রাজ্য সরকার। যে ধার সুদে আসলে বেড়েই চলেছে, শোধের আশা দুরাশা।
কেন্দ্রে এলো পৃথিবীর সবচেয়ে নির্মম ও বেনিয়া সরকার। কংগ্রেসের তৈরি করা সব শিল্প, কলকারখানা একে একে বেচতে শুরু করে দিল। রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলো, রেল, ব্যাঙ্ক, বীমা, এয়ার ইন্ডিয়া, অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টারি, পোর্ট, ট্যাঁকশাল সব বেচা শুরু হয়ে গেল।

কিন্তু কিনবে কে? বাম ও তৃণমূল আমলের মালিক খ্যাদাও নীতি তো এখন বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে। তাই ঐ দেশী বিদেশী বেনিয়াদের জন্য ৪৭ টি প্রধান শ্রমিক আইনের অবলুপ্তি ঘটিয়ে মাত্র চারটি শ্রমিক বিরোধী লেবার কোড আনার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বিজেপি সরকার। শ্রমিকদের স্বাভাবিক অধিকার চাওয়ার সবরকম রাস্তাই বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে এই লেবার কোড-এর মাধ্যমে, যার প্রধান উদ্দেশ্য হলো স্থায়ী কাজের অধিকার হরণ। EDSO21, ESMA আইনের মাধ্যমে রুটি রুজির জন্য আন্দোলন রোধ। যেনতেনভাবে সব বেচে দেশকে আবার পরাধীন করতে উঠে পড়ে লেগেছে মোদী সরকার। আন্দোলন করতে গেলেই ধর্মের সুড়সুড়ি দিয়ে মানুষের মন অন্য দিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার নোংরা খেলাও আছে এর সঙ্গে।

কলকারখানা বন্ধ। শিল্প ধুলিসাৎ। মানুষের রোজগার নেই। যাওবা ছিল লকডাউনে সেটুকুও গেছে। সরকারের রাজস্ব আদায় নামমাত্র। স্বাভাবিকভাবেই পয়সা না থাকায় লক্ষ লক্ষ শূন্য পদে নিয়োগ বন্ধ।

অতঃকিম! আন্দোলন করে কারা? মধ্যবিত্ত শ্রেণী। সরকারি উদ্যোগে সুপরিকল্পিতভাবে মধ্যবিত্ত শ্রেণী আজ অবলুপ্তির দোরগোড়ায়। রোজগারহীন মধ্যবিত্ত নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য, রান্নার গ্যাস, শাকসবজি ও ভোজ্য তেলের আকাশছোঁয়া মূল্যবৃদ্ধির ফাঁসে আটকে মৃতপ্রায়। যাকে বলা হয় – Middle Class Economy Crisis. যা দেশের অর্থনীতিকে একবার গ্ৰাস করলে, মুক্তি অসম্ভব।

আর সেই কারনেই বিশ্ববন্দিত অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের দেওয়া ফর্মুলা অনুযায়ী কংগ্রেস সব পরিবারের জন্য নুন্যতম আয় নিশ্চিত করতে চায়, বিগত লোকসভা নির্বাচনে… তাদের ঘোষিত ইস্তেহারে। এর একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল মধ্যবিত্ত শ্রেণীকে বাঁচানোর মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতিকে চাঙ্গা করা ও Middle Class Economy Crisis-এর Black Hole থেকে দেশকে উদ্ধার করা। কিন্তু দেশের মানুষ ধর্মের সুড়সুড়িকে বেশি প্রাধান্য দিয়ে কংগ্রেসের নীতিকে অগ্ৰাহ্য করে ও Black Hole-এ ধীরে ধীরে নিমজ্জিত হতে থাকে।

আজ মহান মে দিবস উপলক্ষে একটাই আহ্বান, এখনও সময় আছে। সাবধান হোন। বুঝতে শুরু করুন যে, শিল্প না থাকলে শ্রমিক কথাটাই থাকে না। শ্রমিক না থাকলে মধ্যবিত্ত সমাজ বলে কিছু থাকে না। মধ্যবিত্ত সমাজ না থাকলে বাজারে ক্রেতা থাকে না। ক্রেতা না থাকলে বিক্রেতা থাকে না। রাজস্ব আদায় থাকে না। দেশের স্বাধীন সত্ত্বা থাকে না।

( মতামত লেখকের ব্যক্তিগত)

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published.