*অবশেষে সর্বোচ্চ আদালত মহম্মদ জুবেরের জামিন মঞ্জুর করল*

*অমিতাভ সিংহ*

অবশেষে দেশের সর্বোচ্চ আদালত নিজেদের হৃত সন্মান কিছুটা হলেও উদ্ধার করল alt news এর যুগ্ম প্রতিষ্ঠাতা মহম্মদ জুবেরের অন্তর্বর্তিকালীন জামিন মন্জুর করে।বিচারপতি ডি ওয়াই চন্দ্রচূড়,বিচারপতি সূর্যকান্ত ও বিচারপতি এ এস বোপান্নার ডিভিশন বেঞ্চে গত ২০ জুলাই এই মামলার শুনানি হয়। এই বেঞ্চ alt news যারা মূলত মিথ্যা ও বানানো খবরের সত্য উন্মোচন (fact check) করার ব্যাপারে বিশেষ কৃতিত্বের অধিকারী, তার প্রতিষ্ঠাতা মহম্মদ জুবেরের চার বছর আগে করা একটি টুইটের তথাকথিত অপরাধে দিল্লি পুলিশ ও অন্য বানানো অভিযোগে উত্তরপ্রদেশ সরকারের করা সমস্ত মামলার প্রত্যেকটিতে এই জামিন মন্জুর করে।তারপরই জুবের তিহার জেল থেকে মুক্তি পান।সরকার জুবেরের টুইটে আগাম লাগাম দেওয়ার আর্জিও খারিজ করে। আদালতের পর্যবেক্ষণ সাংবাদিককে লেখা থেকে বিরত করা যায়না। যেমন আইনজীবীকে বিতর্ক না করার শর্ত দেওয়া যায় না। তাদের আরও পর্যবেক্ষণ ফৌজদারি আইন জুবেরকে হয়রান ও চুপ করে থাকার জন্য ব্যবহার করতে পারে না।এমনকি বেঞ্চ জুবের সব এফআইআর বাতিলের জন্য দিল্লী হাইকোর্টেও যেতে পারবেন বলে রায় দিয়েছে।বেঞ্চ উত্তরপ্রদেশ পুলিশের গঠিত বিশেষ তদন্তকারী দলও ভেঙে দিতে বলেছে।বেঞ্চ বলেছে ভবিষ্যতে কোন টুইটের জন্য কোন এফআইআর হলেও জুবের জামিন পাওয়ার অধিকারী হবেন।এছাড়া বেঞ্চ গ্রেপ্তারির ক্ষমতা সংযতভাবে প্রয়োগ করার কথাও মনে করিয়ে দিয়েছেন। তাঁরা জুবের -এর আইনজীবী কলিন গনসালভেসের বক্তব্য Bail is the law , Jail is the exception এই বক্তব্য অনুমোদন করে আটক রাখার বিরুদ্ধে মতপ্রকাশ করেছেন। বর্তমানে দেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সরকারের বিভিন্ন কাজের সমালোচনা করার অধিকারের ওপর এবং বিজেপির মিথ্যা তথ্য প্রচারের আবরণ উন্মোচনকারীদের ওপর আক্রমণ দিন দিন যত বেড়ে চলেছে, ততই দেশের গোটা বিচারব্যবস্থা শুধু ভেঙে পড়ছে তাই নয় বরং তারা দিন দিন প্রশাসনমুখী বিচারবিভাগের দিকে এগিয়ে চলেছে বলেই অভিযোগ উঠেছে যা যথার্থ বলেই মনে হয়।এই অধঃপতনের জন্যই ইদানিং এক্সিকিউটিভ কোর্ট শব্দটি বার বার ব্যবহৃত হচ্ছে। জাকিয়া জাফরি মামলায় সুপ্রিম কোর্টের কতিপয় বিচারপতি SIT এর তথাকথিত Investigation এর পরিত্রাতা হিসাবে শুধু অবতীর্ণ হলেন তাই নয়, যাঁরা ২০০২ সালের গুজরাট দাঙ্গায় সর্বস্ব হারিয়েছেন, তাঁদের পক্ষে যিনি দাঁড়ান ও সৎ পুলিশ অফিসারদের তাঁদেরই অপরাধী বানিয়ে, একতরফা বিচার করে, তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থার দিকনির্দেশ করলেন।সাথে সাথেই সমাজকর্মী ও আইনজীবী তিস্তা শেতলবাদকে গ্রেপ্তার করল অমিত শাহ্‌র পুলিশ।ন্যায়বিচার চাইতে যারা আদালতে এসেছিলেন তাদের এই হাল দেখে তামাম দেশবাসী শুধু বিষ্ময়ে হতবাক হয়ে পড়েছিলেন তাই নয় তাদের বিচারবিভাগের ওপর আস্থাটাও চলে গিয়েছিল। আরেকটি মামলার উল্লেখ করা যেতে পারে তা হল জি নিউজ চ্যানেলের সঞ্চালক রোহিত রঞ্জনের সাম্প্রতিক ঘটনাটি। সে একটা ভুয়ো ভিডিও ছড়িয়ে স্থান কাল পাত্র বদলে রাহুল গান্ধিকে খুনীদের সমর্থক বলে দেগে দেওয়ার চেষ্টা করে। কংগ্রেস আদালতে যাওয়ার হুমকি দেওয়ায় সঙ্গে সঙ্গে চ্যানেলটি নিশর্ত ক্ষমা চায়। রোহিত রঞ্জনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন রাজ্যে এফআইআর দায়ের হয়। সব রাজ্যে দায়ের হওয়া মামলাগুলিকে দিল্লীতে আনার আবেদন জানালেন রোহিত রঞ্জন।শুনানি হল।দিল্লি হাইকোর্টের বিচারপতিদ্বয় ইন্দিরা ব্যানার্জী ও জেকে মহেশ্বরীর বেঞ্চ রায় দিল কোনও রাজ্যের পুলিশ তার বিরুদ্ধে কোনও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারবে না ও গ্রেপ্তার করতে পারবে না।অথচ একই বেঞ্চ মহম্মদ জুবেরের জামিনের ক্ষেত্রে একইরকম উদার হতে পারলেন কই? তাকে শর্ত চাপানো হল।টুইট না করার ফতেয়াও দিল বেঞ্চ।কি দোষ ছিল জুবেরের? যে টুইটের জন্য উত্তরপ্রদেশের সীতাপুরের পুলিশ এফআইআর করেছিল তাতে বলা হয় জুবের হিন্দু সাধু যতি নরসিংহানন্দ সরস্বতী, বজরং মুনি ও আনন্দস্বরূপকে ঘৃণার কারবারি বলেন।এর ফলে উক্ত নমস্য ব্যক্তিদের অসম্মান করা হয়েছে ও হিন্দুদের ভাবাবেগে আঘাত করা হয়েছে।এরা কেমন সাধু তা একবার দেখে নেওয়া যাক।নরসিংহানন্দ হরিদ্বারে ধর্মসংসদে হিন্দুদের প্রতি আহ্বান জানান যাতে তারা হাতে অস্ত্র তুলে নিয়ে মুসলীমদের গণহত্যা করে।দিল্লীতেও তিনি ইসলাম ও হজরত মহম্মদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক কুকথার ফুলঝুরি ছোটান।বজরং মুনি মুসলীম মহিলাদের অপহরণ করে ধর্ষণের আহ্বান জানিয়েছিলেন।এটাই জুবের টুইট করেছিলেন।আবার আনন্দস্বরূপ বলেছিলেন যারা কোরান পড়ে তারা পশুতে পরিণত হয়।যারা ভারতে থাকতে চান তাদের কোরান ও নামাজ ছাড়তে হবে।তিনি একইসাথে হিন্দুরাষ্ট্র গঠনের জন্য হাতে অস্ত্র তুলে নেওয়ার ডাক দেন হিন্দুদের কাছে।এরাই উত্তরপ্রদেশ বা দিল্লী পুলিশের কাছে নমস্য! আর এদের কুকথা প্রকাশ্যে আনার জন্য জুবেরের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হল তাকে জেলে পুরে।সত্য বলাটা পুলিশ ও প্রশাসনের কাছে অপরাধ ! জুবেরের আইনজীবী কলিন গনসালভেস বিচারপতিদের উদ্দেশে বলেই ফেললেন , যারা ঘৃণ্য ভাষণ দিচ্ছেন তারা মুক্ত,আর যিনি এই ঘৃণ্য ভাষণ উন্মোচিত করছেন তিনি আজ জেলে।এটাই চরম বিভ্রান্তিকর। জুবের কোন ধর্মের অবমাননা করেন নি,বরং তিনি সোচ্চার হয়েছেন তাদেরই বিরুদ্ধে যারা ভয়াবহ ঘৃণ্য বক্তব্য রেখেই চলেছেন।পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করলে তারা জামিনে ছাড়া পায়।তারা জেল থেকে বেরিয়ে আবার একই অপরাধ বার বার করে। অপরাধী আর সত্যসন্ধানীর মধ্যে তালগোল পাকিয়ে দেওয়া হচ্ছে।এর পেছনে বিচারপতিদের ভূমিকাও কম নয়।

যে টুইটের জন্য জুবেরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল তা ২০১৮ সালের একটা নিরীহ টুইট। ‘কিসিসে না কহেনা ‘ নামে এক হিন্দি ছায়াছবির একটা দৃশ্য।এটাকেই চার বছর পর পুলিশের মনে হল এটা আসলে এক প্ররোচনামূলক টুইট। এতদিন তাহলে পুলিশ কি করছিল? আবার এই মামলার জামিনের শুনানির দিন দেখা গেল বিচারপতির রায়ের চার ঘন্টা আগেই এক পুলিশ অফিসার জানিয়ে দিলেন কি রায় হয়েছে।কি করে এটা ঘটল? এটাতে নিশ্চিতভাবে বলার অবকাশ আছে যে দিল্লী পুলিশ ও বিচারপতির ( ম্যাজিষ্ট্রেট) মধ্যে গোপন বোঝাপড়া ছিল। নাহলে এহেন নির্বিষ টুইট বিচারপতির চোখে ধরা পড়ল না কেন? অর্থাৎ রায় আগেই ঠিক করা ছিল,বিচারটি ছিল এক লোকদেখানো বিচার বা আইওয়াশ। সুপ্রীম কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি মদনমোহন লোকুর এই ঘটনাটিকে ধিক্কার জানিয়ে বলেছেন বিচারব্যবস্থার পক্ষে এর চেয়ে আরও নীচে নামা দুষ্কর।এখন দেখার বিষয় সরকারি চাপের কাছে নতি স্বীকার করে বিচারবিভাগ আর কতটা নীচে নামার জন্য তৈরী।কতটাই বা ভ্রষ্টাচার করতে পারবেন আমাদের বিচারবিভাগ।আসলে এই টুইটটি একটা উপলক্ষমাত্র।জুবের অনেকদিন ধরেই সরকারের রোষানলে পড়েছেন।তিনি অল্ট নিউজ প্রতিষ্ঠা করেছেন প্রতীপ সিনহা, প্রিয়ানকা ঝা, পূজা চৌধুরী ও জিগ্নেশ পটেলকে নিয়ে।এই সংস্থা বিজেপির অমিত মালব্যর বিখ্যাত ‘ আইটি সেলের ‘ ভুয়া সংবাদ প্রচার ও তার সাথে দেওয়া তথ্যের আসল সত্যটাকে বার করে এনে সত্যের প্রতিষ্ঠা করত।এরকম কয়েকটা উদাহরণ দেওয়া যাক।

★শাহিনবাগে মহিলাদের টাকা দিয়ে আনা হয়েছে

★সিএএ মঞ্চ থেকে পাকিস্থান জিন্দাবাদ স্লোগান দেওয়া হয়েছে

★ সুদর্শন নিউজের পবনহংস হিন্দু ছাত্রদের প্রতি বিভেদমূলক আচরন করছে

★বিপিন রাওয়াতের মৃত্যুর পর রবীশকুমারের নামে মিথ্যা টুইট

★ত্রিপুরার হিংসার ছবি বাংলাদেশের ঘটনা বলে চালানো

★ মিথ্য খবরের ভিত্তিতে মিশনারীদের ওপর আক্রমণের চেষ্টা।

এধরনের আরে বহু মিথ্যা প্রচারের মধ্যে আসল ঘটনাকে সৎভাবে তারা জনগণের কাছে আনতেন বিশেষ প্রযুক্তি ও গবেষণা করে।নূপুর শর্মার নিম্নরুচিকর হিংসা ছড়ানোর বক্তব্য জুবেরই প্রথম জনসমক্ষে আনেন।বস্তুত এরপরেই তার প্রতি সরকার তথা বিজেপির রাগ ও আক্রোশ তীব্র হয় ও তাকে শায়েস্তা করতে যেকোন উপায়ে জেলে পোরার উদ্যাগ নেওয়া হয়।

পন্ডিত নেহেরুর আমল থেকে আমরা দেখে আসছি নিপীড়িতেরা রাজনৈতিক কারাবাস থেকে মুক্তি পেতে আদালতের শরণাপন্ন হন।আমাদের বিচারব্যবস্থা সেই আস্থা মানুষের মধ্যে তৈরী করতে পেরেছিলেন একসময়।কিন্তু এখন বিচারবিভাগ কেমন করে যেন কুঁকড়ে গিয়ে শাসকশ্রেণির সুরে সুর মেলাচ্ছে।অর্থ,অবসরের পর সন্মানজনক পদ ও সুবিধা নাকি প্রাণভয় , তা তারাই জানেন। নাহলে সরকারের অন্যায় আচরণ কেন তাদের চোখে পড়ে না? সংবিধান অবমাননার মামলাগুলি যেমন সিএএ, ৩৭০ ধারা রদ, ইলেক্টোরাল বন্ড নিয়ে যে মামলাগুলি দীর্ঘদিন আগেই হয়েছে তা কেন আদালতে ওঠে না? কেনইবা বিচারপতিরা এই মামলাগুলি এড়িয়ে চলেন? প্রধান বিচারপতি এন ভি রমনার আমেরিকায় বলা ” বিচারবিভাগ একমাত্র সংবিধানের কাছে দায়বদ্ধ ” বাক্যটি বড়ই খেলো বলে কি মনে হয় না।।

Sent from RediffmailNG on Android

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published.