স্বাধীনতা সংগ্রাম , আরএসএস ও জাতীয় পতাকা

শান্তনু দত্ত চৌধুরী

১৯২৫ সালে বিজয়া দশমীর দিন। নাগপুরে ডা. বি এস মুঞ্জে, ডা. এল ভি পরাঞ্জপে , ডা.বি বি থালকার, বাবুরাও সাভারকর (বিনায়ক দামোদর সাভারকরের ভাই ), ডা.কেশব বলিরাম হেডগেওয়াড় — এই পাঁচ জন মিলে একটি হিন্দুত্ববাদী সংগঠন গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেন।প্রথম চারজন ছিলেন হিন্দু মহাসভার নেতা।তাঁরা এই সিদ্ধান্ত আসেন যে উচ্চবর্ণের হিন্দুরা কোনো সংঘর্ষ হলে নিজেদের প্রতিরক্ষা বিধান করতে সক্ষম নন। উচ্চবর্ণের হিন্দু সন্তানদের শৈশবেই এই সংগঠনে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে ও তাদের শারীর শিক্ষা ও কসরৎ শেখাতে হবে যথা লাঠি খেলা, ছোরা খেলা, বর্ষা ছোঁড়া ইত্যাদি। ১৯২৬ এর বিজয়া দশমীর দিন ওই সংগঠকরা আবার মিলিত হয়ে সংগঠনের নামকরণ করেন ‘ রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ ‘ ।

ডা. হেডগেওয়াড় ও অন্যান্যরা মনে ‌করেন ‘রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ‘ ও ‘ হিন্দুত্ব ‘ সমার্থক। সংঘ ও রাষ্ট্র ‘ র পতাকা হবে গৈরিক। যা প্রথমে রামচন্দ্র ও পরে ছত্রপতি শিবাজী বহন করতেন।এরা এই গৈরিক পতাকাকে ‘ ভাগোয়া ‘ ঝান্ডা বলেন।

ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে কোনো দ্বন্দ্ব নেই

আর.এস.এস এর সঙ্গে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের যে কোনো দ্বন্দ্ব ছিলনা তা ডা.হেডগেওয়াড়ের বক্তৃতা , সংঘের ইতিহাস ও পরবর্তী সরসংঘ চালক এম‌.এস.গোলওয়ালকরের লেখাপত্র পড়লেই জানা যায়।ডাক্তার সাহেবের জীবনীকার সি. পি. ভিসিকার লিখেছেন ‘ ডাক্তার সাহেব মনে করতেন ব্রিটিশ রাজের সঙ্গে ভারতীয়দের কোনও দ্বন্দ্ব নেই, দেশে প্রধান দ্বন্দ্ব হিন্দুদের সঙ্গে মুসলমান ও খ্রিস্টানদের।’ তাদের কর্মপদ্ধতি তারা সেইভাবেই নির্ধারণ করেছিল।লাঠি – সোটা নিয়ে যে সাম্রাজ্যবাদকে উচ্ছেদ করা যায় না তা আর.এস.এস. ভালোই বুঝতো।সংঘের পোশাক ছিল খাঁকি হাফ প্যান্ট ও সাদা হাফ শার্ট,মাথায় কালো টুপি। মিলের কাপড়।সংঘ কখনো বিলাতি বস্ত্র বয়কটের ডাক দেয়নি।চরখা ও খাদির সঙ্গে আর এস এস – এর কোনও সম্পর্কই ছিলনা। পুলিশের মতন পোশাক করা হয়েছিল জনসাধারণের মনে যুগপৎ ভয় ও সমীহ সৃষ্টির জন্য।স্থানীয় দাঙ্গা হাঙ্গামার সময় সংঘ সদস্যরা যাতে উপযুক্ত ভূমিকা পালন করতে পারে তার জন্য প্রশিক্ষণ দেওয়া হত। এখনও হয়।

১৯২৬ – ১৯২৭ সাল থেকেই দেশের নানা প্রান্তে মানুষ নানা পদ্ধতিতে বৃটিশ শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানতে থাকে।ভারতবাসীকে কতটা শাসনতান্ত্রিক অধিকার দেওয়া যায় তাই খতিয়ে দেখতে ১৯২৮ সালে সাইমন কমিশন আসে ভারতে।এই কমিশনের সকল সদস্যই ছিল শ্বেতাঙ্গ।প্রতিবাদে কংগ্রেস সাইমন কমিশন বয়কটের ডাক দেয়। সারা দেশজুড়ে এই প্রতিবাদ আন্দোলনে হিন্দু মহাসভা ও আর এসএস যোগ দেয়নি।সংঘের ইতিহাসে অবশ্য ১৯২৭ সালে নাগপুরে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় আর.এস.এস কীরকম‌ বীরত্ব দেখিয়েছিল তার বর্ণনা আছে।

১৯২৯ সালে লাহৌর কংগ্রেস অধিবেশনে জওহরলাল নেহরুর সভাপতিত্বে কংগ্রেস পূর্ণ স্বাধীনতার প্রস্তাব গ্রহণ করে । ১৯২৯ এর ৩০ ডিসেম্বর মধ্যরাতে লাহৌরে রাভি নদীর তীরে জওহরলাল নেহরু তৃবর্ণরঞ্জিত জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন। মনে রাখতে হবে এর ১৮ বছর পর ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট লালকেল্লার ওপরে তৃবর্ণরঞ্জিত জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন আমাদের প্রথম প্রধানমন্ত্রী পন্ডিত জওহরলাল নেহেরু। ১৯২৯ এর লাহৌর কংগ্রেস অধিবেশনে সিদ্ধান্ত হয়েছিল, ১৯৩০ সাল থেকে প্রতি বছর ২৬ জানুয়ারি তারিখটি স্বাধীনতা দিবসরূপে পালিত হবে।ওই দিন দেশব্যাপী সভা সমাবেশ হবে। সর্বত্র তৃবর্ণরঞ্জিত জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হবে।সাফাই, সূত্রযজ্ঞ ,অস্পৃশ্যতা বিরোধী কর্মসূচি পালিত হবে।আর.এস.এস প্রধান ডাক্তার হেডগেওয়ার জানান , আর.এস.এস এই কর্মসূচিতে যোগ দেবে না।তবে ব্যাক্তিগতভাবে সংঘের কোনও সদস্য চাইলে নিজ বাড়িতে ওই ভাগোয়া ‌ঝানডা তুলতে পারেন, তেরঙ্গা পতাকা নয়।২৬ জানুয়ারি তারিখটি বর্তমানে প্রজাতন্ত্র দিবসরূপে পালিত হয়।পরাধীন ভারতে ওই দিনটি পালন করতে গিয়ে সাধারণ মানুষকে অসম্ভব দমন পীড়ন সহ্য করতে হত। আরএসএস ( বর্তমানে বিজেপি যার শাখা সংগঠন ) কখনও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে কোনো সংগ্রামে যোগ দেয়নি ও জাতীয় পতাকা হাতে নেয়নি।

১৯৩০ – ১৯৩১ লবণ আইন অমান্য আন্দোলন ও ১৯৩২ এর আইন অমান্য আন্দোলনে সংঘ পরিবার যোগ দেবেনা বলে ডাক্তার সাহেব জানিয়ে দিয়েছিলেন।তবে তিনি বলেন কোনও সদস্য ব্যক্তিগত ভাবে চাইলে এই আন্দোলনে যোগ দিতে পারেন।আর.এস.এস এর ইতিহাসকার সি.পি.ভিসিকার লিখেছেন ডাক্তার সাহেব হিন্দুদের ও হিন্দু সংগঠন- গুলিকে‌ ঐক্যবদ্ধ হবার জন্য বারবার বলছেন, কিন্ত ব্রিটিশ শাসন সম্পর্কে তিনি বরাবরই নীরব ছিলেন।১৯৩৪ সালে সংঘের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশনে তিনি হিটলার ও মুসোলিনির পথ অনুসরণ করার ‌কথা‌ বলেন।ডা.মুনজে তাঁকে সমর্থন করেন।

১৯৩৩ সালে মহাত্মা গান্ধির নির্দেশে কংগ্রেসের প্রবীণ গান্ধিবাদী নেতা যমুনালাল বাজাজ ডা.হেডগেওয়ারের কাছে বিভিন্ন প্রশ্নে সংঘের কি মনোভাব তা জানতে চান।ডাক্তার সাহেব অবশ্য যমুনালালজির সঙ্গে দেখা করে তাদের সম্পর্কে যে সব অভিযোগ উঠেছিল ও সন্দেহ দেখা দিয়েছিল তা দুর করার চেষ্টা করেন। কিন্তু যমুনালালজি ডাক্তার সাহেবের ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট হননি। ‌১৯৩৪ সালে একটি প্রস্তাব গ্রহণ করে কংগ্রেস তার কর্মী ও সদস্যদের হিন্দু মহাসভা, মুসলিম লিগ ও আর.এস.এস – এর সদস্য হওয়া নিষিদ্ধ করে।কারণ এই ৩ টি সংগঠনই ধর্মের ভিত্তিতে মানুষকে বিভক্ত করার জন্য সাম্প্রদায়িক প্রচার চালাচ্ছিল।

বাংলার গুপ্ত বিপ্লববাদী আন্দোলনের বিখ্যাত নেতা ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী মহারাজ তাঁর ‘ জেলে ত্রিশ বছর ও পাক ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম ‘ গ্রন্থে লিখেছেন, তিনি ও বাংলার বিপ্লববাদী আন্দোলনের বিরাট সংখ্যক সংগঠক ১৯৩৯ সালে গান্ধিজির হস্তক্ষেপে জেল থেকে মুক্তি পান ও পুনরায় আত্মগোপন করেন। গান্ধিজি তাঁদের বলেছিলেন তিনি শীঘ্রই চূড়ান্ত সংগ্রামের ডাক দেবেন।মহারাজ তাঁদের সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বিভিন্ন রাজ্য ঘুরে নাগপুরে এসে উপস্থিত হন। এখানেই সংঘের সদর দপ্তর।কলকাতায় মহারাজের এক সম্পর্কিত ভাই ছিলেন ডা.হেডগেওয়াড়ের সহপাঠী। ডাক্তার সাহেব যখন ১৯১০ সাল নাগাদ কলকাতায় ন্যাশনাল মেডিক্যাল স্কুলে ডাক্তারি পড়তেন , তখন সেই ভাইয়ের সঙ্গে মাঝে মধ্যে অনুশীলন সমিতির গোপন কেন্দ্রে আসতেন।তিনি ত্রৈলোক্যনাথ মহারাজকে দেখে খুবই খুশি হন ও আদর যত্ন করেন।কিন্তু মহারাজ যখন তাঁকে আসন্ন ব্রিটিশ বিরোধী চূড়ান্ত সংগ্রামে আরএসএস এর যোগদানের প্রস্তাব দেন , তিনি অত্যন্ত ভদ্রতার সঙ্গে তা ফিরিয়ে দেন।ডা. হেডগেওয়ার বলেন কোনো ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রামে তাঁরা যোগ দেবেন না। ব্রিটিশ গোয়েন্দা বিভাগ আগস্ট আন্দোলনের সময় অত্যন্ত সন্তোষের সঙ্গে তাদের রিপোর্টে বলে ’আর.এস.এস কোনও রকম আন্দোলনে যোগ দেয়নি।তারা আইন মেনে চলছে এবং সরকারের সঙ্গে সহযোগিতা করছে।’ আগস্ট আন্দোলনের সময় ১৯৪৩ সালে (বাংলা ১৩৫০ ) বাংলায় ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ হয়।এই দুর্ভিক্ষ সম্পর্কে তৎকালীন আরএসএস -এর সরসঙ্ঘ চালক এম এস গোলওয়ালকর যা বলেন তা যথেষ্ট ‌চিত্তাকর্ষক।তিনি বলেছিলেন ” এই দুর্ভিক্ষ ও তার পরিণতির জন্য সংঘ কাউকে দায়ী করতে ‌চায়‌না।যখন জনসাধারণ‌ এই সব ঘটনার জন্য কাউকে ‌দায়ী করতে চায় তখন তাদের যে দুর্বলতা আছে তা ফুটে ওঠে।দুর্বলের প্রতি সবলের যে অবিচার তার জন্য সবলকে দায়ী‌ করার কোনও অর্থ হয় না।এটি একটি ব্যর্থ প্রচেষ্টা।সংঘ (আরএসএস) অন্যদের ( পড়ুন ব্রিটিশ সরকার) সমালোচনা করে তাদের মূল্যবান সময় নস্ট করতে চায় না।আমরা ‌যদি ‌জেনে থাকি যে প্রকৃতির রাজ্যে এটাই নিয়ম যে বড় মাছ ছোট মাছকে খাবে, তখন বড় মাছের ওপর দোষ চাপানো এক রকম বাতুলতা।প্রকৃতির নিয়ম (Law of Nature ) তা ভালো খারাপ ‌যাই হোক তা সব যুগেই সত্য। এই নিয়মকে সঠিক নয় (Unjust) বলে পরিবর্তন করা যায় না।” মজুতদার , কালোবাজারি ও তাদের পৃষ্ঠপোষক ব্রিটিশ সরকার সম্পর্কে এই ছিল গোলওয়ালকর ও সংঘের দৃষ্টিভঙ্গি।তিনি বলেছিলেন ” এই দুর্ভিক্ষ ও তার পরিণতির জন্য সংঘ কাউকে দায়ী করতে ‌চায়‌না।” ১৯৪৩ সালের ২১ অকটোবর নেতাজি সুভাষচন্দ্র সিঙ্গাপুরে আজাদ হিন্দ সরকার প্রতিষ্ঠা করেন।ওই সরকারও ওই তৃবর্ণরঞ্জিত চরখা শোভিত পতাকাকে তাঁর আজাদ হিন্দ সরকারের পতাকারূপে গ্রহণ করেন। ১৯৪৭ সালের ২২ জুলাই সংবিধান প্রনয়ণকারী গণ পরিষদে পন্ডিত নেহরুর প্রস্তাবক্রমে এই তৃবর্ণরঞ্জিত পতাকা জাতীয় পতাকারূপে গৃহীত হয়। পতাকার মধ্যস্থলে সম্রাট অশোকের সারণাথ স্তম্ভের চক্র স্থাপিত হয়। ১৯২১ সালে মহাত্মা গান্ধির নির্দেশে এই পতাকার পরিকল্পনা করেছিলেন বিশিষ্ট শিল্পী পিঙ্গালি বেঙ্কাইয়া।এই পতাকা খাদি বস্ত্রে বয়ন করা। সংবিধান অনুযায়ী জাতীয় পতাকা কখনোই সিনথেটিক কাপড়ে নির্মিত হতে পারে না।১৯৪৭ এর ১৫ আগস্ট লাখো মানুষের রক্তের বিনিময়ে দেশ স্বাধীন হয়। সর্বত্র তৃবর্ণরঞ্জিত জাতীয় পতাকা উত্তোলিত হয়। ব্যতিক্রম আরএসএস – এর সদর দপ্তর। এরা স্বাধীনতা সংগ্রামেও ছিলনা স্বাধীনতার পর দেশগঠনের কাজেও ছিলনা। সকলেই জানেন হিন্দুত্ত্ববাদী সাম্প্রদায়িক শক্তির সক্রিয় মদতে মহাত্মা গান্ধি নিহত হন।এখন আমাদের মহান স্বাধীনতা সংগ্রাম , যার সঙ্গে খাদি বস্ত্রে নির্মিত আমাদের জাতীয় পতাকা ওতপ্রোতভাবে যুক্ত , কোনো ব্যক্তি ‘ হর ঘর তিরঙ্গা ‘ বলে আমদানি করা পলিয়েস্টারে নির্মিত পতাকা উত্তোলন করে , তার ইতিহাস পাল্টে দেওয়ার চেষ্টা করলে দেশের মানুষ তা কখনোই মেনে নেবে না। ইতিমধ্যেই আরএসএস জানিয়ে দিয়েছে তাঁরা তাঁদের মতন করে স্বাধীনতা দিবস পালন করবেন। জাতীয় পতাকা উত্তোলন করবে না। এদিকে কংগ্রেস ও খাদি প্রতিষ্ঠানগুলি জানিয়ে দিয়েছে খাদি বস্ত্রের পরিবর্তে চীন থেকে ক্রনি ক‍্যাপিটালিস্ট মিত্রকে দিয়ে আমদানি করা পলিয়েস্টারে জাতীয় পতাকা নির্মিত হলে তা দেশের মানুষ মেনে নেবেন না।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published.