নেতাজি সুভাষচন্দ্র ধর্মনিরপেক্ষতার মূর্ত প্রতীক

শান্তনু দত্ত চৌধুরী

নেতাজি সুভাষচন্দ্র আজীবন সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরুদ্ধে নিরলস যোদ্ধা ছিলেন। ভারতীয়দের মধ্যে সাম্প্রদায়িক বিভাজন ঘটানোর জন্য ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ও সাম্প্রদায়িক সংগঠনগুলির ঘৃণ্য প্রচেষ্টা সম্পর্কে তিনি ছিলেন সদাসতর্ক।মেধাবী ছাত্র সুভাষচন্দ্র ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় সফল হওয়া সত্বেও হেলায় সেই লোভনীয় চাকুরী পরিত্যাগ করেন।তিনি দেশসেবার ব্রত গ্রহণ করেন ও দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের নেতৃত্বে রাজনৈতিক আন্দোলনে যোগ দেন।১৯২১ – ১৯২২ এর
অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দিয়ে তিনি প্রথম
কারাবরণ করেন।দেশবন্ধু ছিলেন হিন্দু – মুসলিম ঐক্যের মূর্ত প্রতীক।সুভাষচন্দ্র ছিলেন তাঁর মানস সন্তান।দেশবন্ধু কলকাতা শহরের প্রথম ভারতীয় মেয়র।তিনি তরুণ সুভাষকে কলকাতা
পৌরসভার চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার পদে নিয়োগ করেন।দেশবন্ধু পশ্চাদপদ মুসলমান সম্প্রদায়ের জন্য পৌরসভার বিভিন্ন পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে সংরক্ষণের ব্যাবস্থা করেন।তিনি বাংলায় হিন্দু ও মুসলমান এই দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে অভূতপূর্ব ঐক্য স্থাপন করেন। বঙ্গীয় আইনসভার নির্বাচনে দেশবন্ধুর নেতৃত্বে স্বরাজ্য দল বিপুলভাবে জয়লাভ করে।এমনকী
সংখ্যালঘু আসনেও মুসলিম লীগ দেশবন্ধুর দলের কাছে পরাস্ত হয়। পরবর্তী সময়ে ১৯৩০ সালে যখন সুভাষচন্দ্র মেয়র হন তখন তিনিও দেশবন্ধুর নীতি অনুসরণ করেন।
ভারতের ইতিহাস সম্পর্কে সুভাষচন্দ্র ছিলেন প্রগাঢ় জ্ঞানের অধিকারী।তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ Indian Struggle (ভারতের মুক্তি সংগ্রাম) এর ভূমিকা ‘ ভারতীয় রাষ্ট্র ব্যবস্থার পটভূমি ‘ তে প্রাচীন ও মধ্যযুগের ইতিহাস সম্পর্কে তিনি বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ করেছেন। সম্রাট অশোকের
( খ্রিস্টপূর্ব ২৬৮ – ২৩২ অব্দে ) এবং সম্রাট সমুদ্র গুপ্তের ( খ্রিস্টীয় ৩৩০ – ৩৭৫ অব্দে) রাজত্বে ভারতবর্ষ একটি কেন্দ্রীয় শাসনের অধীনে আসে ও সমৃদ্ধির শীর্ষে আরোহণ করে বলে তিনি বর্ণনা করেছেন।এই দুই নৃপতির শাষনের মধ্যবর্তী ও পরবর্তী পর্যায়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কিছু উল্লেখযোগ্য নৃপতি রাজত্ব করলেও প্রাচীন যুগে সমগ্র ভারত আর কখনও কোনও একটি সুসংহত কেন্দ্রীয় শাসনের অধীনে আসেনি।ভারতবর্ষের বুকে ইসলাম ধর্মাবলম্বী শাসকদের অভিযান শুরু হয় খ্রিস্টীয় দশম শতকে।নেতাজি লিখেছেন ” কিন্তু দেশব্যাপী ঐক্য স্থাপন এবং সর্বব্যাপী অগ্রগতির কৃতিত্ব মুঘল বাদশাহদের জন্যই সঞ্চিত ছিল।ষোড়শ এবং সপ্তদশ শতকে, মুঘল
সম্রাটদের শাসনকালে,ভারতবর্ষ আরও একবার
অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছায়।তাঁদের মধ্যে সর্বোত্তম ছিলেন আকবর ; যিনি ষোড়শ শতাব্দীর শেষার্ধে রাজত্ব করেন।দেশে
রাজনৈতিক ঐক্য প্রতিষ্ঠাই আকবরের প্রধান কীর্তি ছিল না, বোধহয় অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ ছিল পুরাতনের সঙ্গে সংস্কৃতির নতুন ভাবধারার
মিলন ঘটানোর জন্য একটি নতুন সাংস্কৃতিক সমন্বয় সাধন ও নতুন সংস্কৃতির সৃষ্টি। তিনি যে সাম্রাজ্যশাসন যন্ত্র গঠন করেছিলেন তাও হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়ের ঐকান্তিক সহযোগিতাকে ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছিল।মুঘলদের শেষ প্রধান সম্রাট ছিলেন আওরঙ্গজেব।১৭০৭ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর মৃত্যু হয় এবং
তাঁর মৃত্যুর পর ধীরে ধীরে সাম্রাজ্যের ভাঙন ধরে”।নেতাজি সমসময়ে পশ্চিম মধ্য ভারতে ছত্রপতি শিবাজির নেতৃত্বে মারাঠা শক্তির উত্থানের কথা উল্লেখ করেছেন।কিন্তু অষ্টাদশ শতাব্দীর পর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এবং উপযুক্ত
নেতৃত্বের অভাবে এই শক্তির পতন ঘটল।একই ভাবে উত্তর পশ্চিম ভারতে মহারাণা রণজিৎ সিংহের নেতৃত্বে যে শিখ শক্তির উত্থান হয়েছিল তাও এই মহারাণার মৃত্যুর পর (১৮৩৯ খ্রিষ্টাব্দ ) ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়।
ভারতবাসীর অনৈক্য, হীন চক্রান্ত , সর্বদাই
এক অংশের দেশবাসীর ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে সহযোগিতার কথা নেতাজি তাঁর এই গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন।তিনি বাংলার নবাব সিরাজ – উ – দ্দৌলার বিরুদ্ধে তাঁর প্রধান সেনাপতি মীরজাফরের বিশ্বাসঘাতকতার কথা
উল্লেখ করেছেন।দুজনেই ছিলেন ধর্মে মুসলমান, অপরদিকে নবাবের হয়ে যে সেনাপতি দৃঢ়তার সঙ্গে যুদ্ধ করলেন সেই মোহনলাল ছিলেন হিন্দু।নেতাজি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে টিপু সুলতানের বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামের কথা উল্লেখ করেছেন।এক্ষেত্রেও তিনি বিশ্বাসঘাতক মারাঠা পেশোয়া ও হায়দরাবাদের নিজামের ব্রিটিশদের সঙ্গে সহযোগিতার কথা উল্লেখ করেছেন।
ইংরেজ ঐতিহাসিকরা নবাব সিরাজের চরিত্রে কলঙ্ক লেপনের জন্য চেষ্টার কোনও ত্রুটি রাখেনি।তারা সিরাজ কর্তৃক অন্ধকূপ হত্যার কাহিনী প্রচার করেছিল।তারা বলেছিল নবাবের নির্দেশে একটি ছোট ঘরে শতাধিক ইংরেজ নারী পুরুষকে আটক রাখার ফলে তাদের শ্বাসরোধ হয়ে মৃত্যু হয়।এর স্মৃতিতে তারা ডালহৌসি স্কোয়ারে হলওয়েল মনুমেন্ট স্থাপন করে।নেতাজির নেতৃত্বে ১৯৪০ সালে ‘ হলওয়েল মনুমেন্ট ‘ অপসারণ আন্দোলন শুরু হয়।নেতাজি গ্রেপ্তার হন।কিন্তু অবশেষে ব্রিটিশ সরকার এই মনুমেন্ট অপসারণ করতে বাধ্য হয়। টিপু সুলতানের ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে অসমসাহসী সংগ্রামকে নেতাজি স্মরণীয় করে রেখেছিলেন তাঁর আজাদ হিন্দ সরকারের পতাকায়।টিপু সুলতানের ব্যাঘ্রকেতনের উল্লম্ফনরত বাঘ (Springing Tiger ) স্থান পেয়েছিল আজাদ হিন্দ সরকারের ত্রিবর্ণরঞ্জিত পতাকায় চরখার সঙ্গে।
প্রাচীন ভারতে মৌর্য ,গুপ্ত বা হর্ষবর্ধনের শাসনে প্রজাতান্ত্রিক রাজ্যগুলির অধিকারে হস্তক্ষেপ করা হতনা।সম্রাটের রাজকোষে নিয়মিত রাজস্ব জমা পড়লে প্রাদেশিক শাসন ব্যবস্থা কোনরকম হস্তক্ষেপ ছাড়াই স্বাধীনভাবে পরিচালিত হত।নেতাজি মধ্যযুগের কেন্দ্রীয় মুসলিম শাসকবর্গ সম্পর্কে লিখেছেন ” যদিও
কারও আমলে অসংযত স্বেচ্ছাচার দেখা গিয়েছে ,তদাপি প্রাদেশিক কিংবা স্থানীয় বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকার কদাচিৎ হস্তক্ষেপ করেছেন।
‘ সুবা ‘ বা প্রদেশের শাসনকর্তা অবশ্যই সম্রাটের দ্বারা নিয়োজিত হতেন,কিন্তু সম্রাটের রাজকোষে নিয়মিত রাজস্ব জমা পড়লে প্রাদেশিক শাসন ব্যবস্থায় কোনও রকম হস্তক্ষেপ করা হত না।অন্ধ গোঁড়ামির বশে, কখনও কখনও এক একজন শাসক ধর্মান্তরিত করার চেষ্টা করতেন বটে, কিন্তু দিল্লির সিংহাসন যিনিই দখল করুন না কেন — ধর্মীয়,সাংস্কৃতিক ও সামাজিক বিষয়ে জনগণ মোটের উপর পূর্ণ
স্বাধীনতা ভোগ করতেন।ব্রিটিশ ঐতিহাসিকদের প্রায় সকলেরই এই দোষ যে, তাঁরা এই বিষয়টি
উপেক্ষা করে থাকেন , যে জনগণ বহুল পরিমাণে প্রকৃত স্বাধীনতা ভোগ করতেন,ব্রিটিশ শাসনে যা থেকে তাঁরা ছিলেন বঞ্চিত।আর্যদের ভারতজয়ের পূর্বে এবং পরে স্বয়ংশাসিত গ্রাম্য প্রতিষ্ঠান ভারতীয় জীবনের একটি চিরন্তন বৈশিষ্ট্য ছিল।কিন্তু ব্রিটিশ শাসনে এই সব প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়ে গেছে এবং আমলাতন্ত্রের দীর্ঘ – বাহু প্রসারিত হয়েছে সুদূরতম পল্লী পর্যন্ত। এমন এক বর্গফুট জমিও অবশিষ্ট নেই যেখানে মানুষে অনুভব করতে পারে যে তাদের নিজস্ব বিষয়কর্ম পরিচালনার ব্যাপারে তারা স্বাধীন।”
নেতাজির আজাদ হিন্দ ফৌজ ও আজাদ হিন্দ সরকার ছিল ধর্ম নিরপেক্ষতা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মূর্ত প্রতীক।নেতাজি ১৯৪৩ এর ৮ ফেব্রুয়ারি জার্মানির কিয়েল বন্দর থেকে রওনা দিয়ে ৬ মে বিপদশঙ্কুল সমুদ্রপথ ডুবোজাহাজে অতিক্রম করে উত্তর সুমাত্রার সাবাং দ্বীপে পৌঁছন।এই পথে তাঁর সঙ্গী ছিলেন আবিদ হাসান।তারপর টোকিও হয়ে ১৯৪৩ এর ২ জুলাই দুপুরে একটি ছোট যুদ্ধ বিমানে করে তিনি আবিদ হাসানকে নিয়ে এসে নামলেন সিঙ্গাপুরে। হিন্দুস্তানি ভাষায় মুমতাজ হুসেনের লেখা ও রাম সিংহ ঠাকুরের সুর দেওয়া গান গেয়ে অভ্যর্থনা জানানো হল প্রিয় নেতাকে
” সুভাষজি সুভাষজি উয়ো জান – এ হিন্দ আ গয়ে,উয়ো নাজ জিসপে হিন্দ কো, উয়ো শান – এ- হিন্দ আ গয়ে।” সুভাষচন্দ্র হচ্ছেন এশিয়ার আলো – ‘ এশিয়াকে আফতাব ‘ এবার এশিয়াতে এসে গিয়েছেন ,এই হচ্ছে গানের বক্তব্য।
( ক্রমশঃ )

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published.