সত্তর বছরে এই প্রথম দেশে হাসপাতালে বেড নেই, নেই অক্সিজেন, নেই দাহ করার জায়গা নেই কবর খোঁড়ার লোক

অমিতাভ সিংহ

মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্ট দেশের সাম্প্রতিক কোভিদ পরিস্থিতিকে জাতীয় সঙ্কটের আখ্যা দিয়ে সরকারের কাছে বেশ কয়েকটি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছে। কোর্ট জানতে চেয়েছে দেশে করোনার প্রতিষেধকের আলাদা আলাদা দাম কেন? করোনা মোকাবিলায় একমাত্র উপায় কি শুধুমাত্র প্রতিষেধক? এই সঙ্কট মোকাবিলায় কেন্দ্র কি কোন জাতীয় পরিকল্পনা নিয়েছে? একইসাথে রাজ্যগুলির স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর অবস্থা কি? কোর্ট বলেছে এই অবস্থায় তাঁরা নীরব দর্শক হয়ে বসে থাকতে পারে না। প্রয়োজনে হস্তক্ষেপ আদালত করবে। বিচারপতি ধনঞ্জয় চন্দ্রচূড়ের বেঞ্চ অক্সিজেন উৎপাদন বাড়ানো,তা সঠিকভাবে বন্টন,রেমডেসিভিয়ারসহ অন্যান্য ওষুধ করোনা আক্রান্ত রোগীদের কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা সম্পর্কে একাধিক প্রশ্ন তুলে কেন্দ্রিয় সরকারকে তুলোধোনা করেছে।ঠিক সেইসময় প্রধানমন্ত্রী করোনা মোকাবিলায় কেন্দ্রের দায়িত্ব নিজেদের ওপর থেকে ঝেড়ে তা রাজ্য সরকারের ওপর ও জনসাধারণের ওপর চাপিয়ে দিয়েছেন। তিনি প্রমাণ করেছেন দায়িত্ব পালনের থেকে ক্ষমতা ভোগেই তাঁর অগ্রাধিকার। তার বাগাড়ম্বর শুনে যেতে হবে দেশের মানুষকে। কোন প্রশ্ন করা চলবে না। সেই কারনেই তিনি এমতাবস্থায় রাজধর্ম পালন না করে বিভিন্ন রাজ্যের নির্বাচনী প্রচারের মাধ্যমে বড় বড় জমায়েত করে করোনা ছড়িয়ে বেরিয়েছেন।আর নির্বাচন কমিশন চোখ বন্ধ করে প্রধানমন্ত্রীর বেঁধে দেওয়া লাইনে কাজ করে গেছেন। তাই সোমবার মাদ্রাজ হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি সঞ্জীব বন্দ্যোপাধ্যায় সরাসরি কমিশনকে ও তাদের অফিসারদের মানুষ খুনের দায়ে মামলা হওয়া উচিৎ বলে মন্তব্য করেছেন। গত পরশু দিল্লী হাইকোর্টের বিচারপতি প্রতিভা এম সিংহ কেন্দ্রকে নিশানা করে বলেছে’ দেখে মনে হচ্ছে, আপনরা চান মানুষ মরে যাক। ‘ কেন্দ্রের বিধিনিষেধ ভূল বলে মন্তব্য করে তিনি বলেছেন দেশে এখন চরম অবস্থা চলছে।কেন্দ্র ঠিকমত রেমডেসিভিয়ার বিলি করছে না বলেই অক্সিজেন থেকে ইন্জেকশনের কালোবাজারি চলছে।

আমলা- মন্ত্রী চাপানউতোর

এদিকে মন্ত্রী ও আমলাদের মধ্যে এই অবস্থার জন্য কে দায়ী তা নিয়ে ঠেলাঠেলি চলছে। মন্ত্রীরা বলছেন আমলারা ডুবিয়েছেন। আমলারা বলছেন পাঁচ রাজ্যে ভোটের আবহে কৃতিত্ব নিতে প্রধানমন্ত্রী থেকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী করেনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ জয়ের ঘোষণা করে মানুষকে বিপথে চালিত করেছেন। মানুষেরা অত্যুৎসাহী হয়ে সতর্কতা পরিহার করে বিপদ ডেকে এনেছেন।আমলারা জানিয়েছেন যে জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে একাধিকবার প্রথমে সতর্ক করা হয় মহারাষ্ট্র, কেরল, ছত্রিসগড়, পশ্চিমবঙ্গকে এবং পরে পান্জাব,জম্মু-কাশ্মীর,গুজরাট, তেলেঙ্গনা রাজ্যকে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী এবং স্বাস্থ্যমন্ত্রীর যুদ্ধজয়ের ঘোষণা ও দাভোসের ওয়ার্ল্ড ইকোনোমিক ফোরামের সভায় ভারতে কোবিদ নিয়ন্ত্রনে এসে গেছে বলে নিজের ঢাক নিজেই পেটান।

ফলে আমলাদের সতর্কবার্তাতে কোন কাজ হয় নি। এখন তাই বিজেপি নেতারা বিরোধী শাসিত রাজ্যগুলির ওপর দায় চাপাতে ব্যস্ত। প্রধানমন্ত্রীর ব্যর্থতা নিয়ে তোপ দেগেছেন ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল আ্যসোসিয়েশন বা আইএমএ কর্তারাও।বড় বড় নির্বাচনী সভা করার জন্য তাকে সুপার স্প্রেডার বলেও কটাক্ষ করেছেন তারা।

মোদীর ভাবমূর্তি ফেরানোর পরিকল্পনা

গত ২১ ফেব্রুয়ারি বিজেপির জাতীয় পদাধিকারীদের বৈঠকে প্রস্তাব করানো হয়েছিল প্রধানমন্ত্রীর সক্ষম, সহানুভূতিশীল, দায়বদ্ধ ও দূরদর্শী নেতৃত্বে কোভিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধজয় সম্ভব হয়েছে। সেই জয় ঘোষনার মাত্র দুমাসের মধ্যে কোভিদে সংক্রামন ও মৃত্যুর হার ফের নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে যাওয়ায় মোদীর ও বিজেপির প্রধান চিন্তা কি করে মোদীর ভাবমূর্তি ফেরানো যায়।সারা দেশে যেভাবে কোভিদের প্রকোপ বেড়েই চলেছে,দিনে মৃত্যুর সংখ্যা ৩০০০ ছাড়িয়ে গেছে,আক্রান্ত দিনে প্রায় সাড়ে তিন লক্ষ,অক্সিজেন, প্রতিষেধক, আইসিএউ বেড,রেমডেসিভিয়ার ইন্জেকশনের হাহাকার থেকে কবরস্থান ও শ্মশানে দীর্ঘ লাইন,গাজিপুর শ্মশানে জায়গা না পেয়ে পার্ক,মাঠ বা পার্কিং লটে জ্বলন্ত চিতায় দাহ করার দৃশ্য ও তা নিয়ে কংগ্রেসসহ বিরোধীদের প্রবল আক্রমন, মানুষের তীব্র ক্ষোভ,দেশ বিদেশের সংবাদমাধ্যমের সমালোচনা, আদালত থেকে সর্বস্তরের মানুষের সমালোচনার ফলে ইতিমধ্যেই মোদীর ভাবমূর্তি টোল খেয়েছে। তাই মোদীর ভাবমূর্তি ফেরাতে সরকার তথা বিজেপির পাল্টা প্রচারের স্লোগান হবে একমাত্র নরেন্দ্র মোদীই পারেন এই পরিস্থিতি থেকে দেশকে উদ্ধার করতে। তাই কোভিদের বিরুদ্ধে ভারত জিতবেই বলে পাল্টা প্রচারে যাওয়া। তারই মহড়া হল অক্সিজেন এক্সপ্রেস নামের যে ট্রেন চালানো হচ্ছে তার যাত্রাপথে সব ডিভিশনের আরপিএফ ও স্কাউটদের জড়ো করে ট্রেনের সামনে ‘ইন্ডিয়া উইল উইন’ লেখা ব্যানার হাতে ছবি তুলে সারা দেশের প্রচারমাধ্যমে ছড়িয়ে দিতে হবে বলে সরকারি নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এতে নাকি মনোবল বাড়বে।কাদের তা অজানা।মে মাসের শেষে মোদী সরকারের দ্বিতীয় মেয়াদের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে সরকারের সাফল্য তুলে ধরা যাবে কিভাবে তা নিয়ে বিজেপির চিন্তার শেষ নেই।

আগে বিজেপি নেতারা প্রচার করতেন যে মোদীই সারা বিশ্বকে রক্ষা করেছেন বিভিন্ন দেশে টিকা পাঠিয়ে।অথচ এখন ভারতকে টিকা,অক্সিজেন, ওষুধের জন্য কাঁচামালের জন্য আমেরিকা,চিন,পাকিস্তান ইত্যাদি দেশের কাছে নতজানু হতে হচ্ছে।

রাহুল গান্ধি মোদী সরকারকে সতর্ক করিয়ে দিয়ে বলেছেন ” আমি সদ্ভাবের সাথে কেন্দ্রের কাছে আবেদন করছি প্রচারে খরচ না করে টিকা,অক্সিজেন, অন্যান্য স্বাস্থ্য পরিষেবায় নজর দিন।”তিনি টুইটার করে সরব হয়েছেন করোনা সংক্রামণের প্রকৃত চিত্র গোপন করে প্রধানমন্ত্রীর ভাবমূর্তি বাঁচাতেই এখন সর্বশক্তি দিয়ে নেমেছে কেন্দ্র।সত্যের উপর পর্দা ফেলে, অক্সিজেন অভাবের কথা অস্বীকার করে,প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা নথিভুক্ত না করে ভারত সরকার প্রধানমন্ত্রীর ভাবমূর্তিকে বাঁচাতে সর্বপ্রকার চেষ্টায় সচেষ্ট।

আইএমএফের মুখ্য অর্থনীতিবিদ গীতা গোপিনাথ ভারতের স্বাস্থ্য সঙ্কট নিয়ে তাঁর উদ্বিগ্নতা ব্যক্ত করেছেন।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সচিব আ্যডনম যেরব্রেইসিয়াম বলেছেন ভারতে করোনা পরিস্থিতি বিধ্বংসী।

পরীক্ষা,চিকিৎসা, টিকাকরণ কিছুই ঠিকঠাক হচ্ছে না। আরএসএস মুখপাত্র পাঞ্চজন্য’র প্রাক্তন সম্পাদক ও রাজ্যসভার সদস্য তরুন বিজয় নিজেই কোবিদ মোকাবিলার পরিকাঠামো নিয়ে প্রশ্ন তুলে বসেছেন।

হৃদয়হীন সরকার

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ্ পি প্রভাকর,যিনি কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমনের স্বামী,তিনি একটি নিবন্ধে মোদী সরকারকে করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের মোকাবিলায় এই মূহুর্তে আন্তরিক ভাবে যে কিছু করার দরকার তা কঠোর ভাষায় স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। এট নিবন্ধটাকে মোদীর উদ্দেশ্যে খোলা চিঠিও বলা যায়।তিনি বলেছেন করোনা ভাইরাস রুখতে দেশের ৭০ শতাংশ মানুষকে টিকা দিতে হবে।অন্তঃসত্ত্বা ও শিশুদের বাদ দিলে অন্ততঃ ৭০ কোটি ভারতবাসীকে টিকার আওতায় আনতে হবে।তার জন্য প্রয়োজন ১৪০ কোটি ডোজ টিকা। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং এর দায়িত্বশীল পরামর্শগুলি নিয়ে যেভাবে অভব্য ও অধৈর্য আচরনের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী তার উল্লেখ করে তিনি লিখেছেন সরকার সংকটের মাত্রা বুঝতে পারছে না।ভাইরাসের মোকাবিলার চেয়ে রাজনৈতিক ফায়দাতে তাদের নজর বেশি।প্রধানমন্ত্রীর দেশের প্রতি দায়িত্ববোধের কোন হুঁশের প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে না।নিজের জনপ্রিয়তা ও বাকপটুতা দিয়ে নিজের অদক্ষতা ও সরকারের হৃদয়হীন আচরনকে আড়াল করছেন।

টিকা সংবাদ

প্রতিষেধকের ব্যাপারে কেন্দ্রীয় সরকারের এক দেশ এক দামের নীতি না নিয়ে বিভিন্ন দাম ঠিক করে বেসরকারি প্রতিষেধক উৎপাদনকারী সংস্থারগুলিকে সরাসরি ১১১১০০ কোটি টাকা বেশী মুনাফার রাস্তা তৈরি করে দিয়েছে।কংগ্রেস দলের পক্ষ থেকে এই অভিযোগ করা হয়েছে। তারা এক সাংবাদিক সম্মেলন করে জানিয়েছে যে দেশে ১৮ থেকে ৪৫ বছর পর্যন্ত মানুষদের টিকাকরণের জন্য কেন্দ্রীয় সরকার এক পয়সাও খরচ করবে না।সরকারি ও বেসরকারি ব্যাবস্থায় কোভিশিল্ড যথাক্রমে ৪০০ ও ৬০০ টাকায় কিনতে হবে। কোভ্যাক্সিনের দাম পড়বে ৪০০ ও ৬০০ টাকা প্রতি ডোজ।ধরে নেওয়া যাক অর্ধেক মানুষ সরকারি ও বাকি অর্ধেক বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় টিকা নেবেন। সেক্ষেত্রে সিরাম ইনস্টিটিউট ও ভারত বায়োটেক যথাক্রমে ৩৫,৩৫০ কোটি টাকা ও ৭৫,৭৫০ কোটি টাকা মুনাফা করবে। গোটা দেশ যখন অতিমারির কবলে,রোজ হাজার হাজার মানুষ মারা যাচ্ছেন তখন কি করে সরকার দুটি বেসরকারি সংস্থাকে এত মুনাফা করতে দিচ্ছে? উল্লখ্য পৃথিবীর অন্য দেশগুলির তুলনায় এই দুটি সংস্থা এই দেশে টিকা তৈরি করে বিদেশের তুলনায় বেশী দামে দেশবাসীর কাছে বিক্রি করছে।আর তা করতে দিচ্ছে মোদী সরকার।হয়তো নির্বাচনে হেরে গেলে সরকার তৈরি করতে অন্যদলের বিধায়ক কেনার খরচের জন্য আগাম বাজেটের ব্যবস্থা।

এদিকে ১৮ থেকে ৪৫ বছরের জন্য যে এখনই কোন টিকা দেওয়া যাবে না তা স্পষ্ট করে দিয়েছেন সিরাম ইনস্টিটিউট। তারা জানিয়েছে কেন্দ্রের যে বরাত রয়েছে সেই বরাত ১৫ মে এর আগে কোনভাবেই মেটানো যাবে না।তারপর রাজ্যগুলিকে দেওয়ার কথা ভাবা যাবে।সুতরাং নির্বাচন শেষ হওয়ার আগে মর ১ মে থেকে ১৮-৪৫ বছর বয়সীদের টিকাকরণের যে ঘোষনাটি মোদী করেছিলেন তা যে শুধুমাত্র নির্বাচনে জেতার অস্ত্র তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। প্রধানমন্ত্রী তার বিখ্যাত মন কি বাত অনুষ্ঠানে এই প্রসংগটি এড়িয়ে গেলেন।এক বছর প্রস্তুতির সময় পাওয়া সত্বেও দেশ কেন এত বিপর্যস্ত, বিরোধীদের করা অভিযোগের কোন জবাবই পাওয়া গেল না।খালি বাগাড়ম্বর আর নিজের পিঠ নিজে চাপড়ানো ছাড়া।

রাষ্ট্রায়ত্ব সংস্থাকে কেন প্রতিষেধক উৎপাদনে কাজে লাগানো হল না
আই সি এম আর রিসার্চ থেকে ভারত বায়োটেক টিকা তৈরি করছে।একটি বেসরকারি সংস্থাকেই কেন টিকা উৎপাদনের দায়িত্ব দেওয়া হল কেন? বিশেষতঃ যখন নয় নয় করে সাতটি রাষ্ট্রয়ত্ব সংস্থা দেশে আছে যারা টিকা উৎপাদন করতে সক্ষম। ভারত ইমিউনলজিক্যালস ও বায়োলজিক্যালস কর্পোরেশন,হাফকাইন বায়ো ফার্মাসিউটিক্যাল কর্পোরেশন,হিউম্যান বায়োলজিক্যালস ইনস্টিটিউট,এইচ এল এল বায়োটেক, বিসিজি ভ্যাকসিন ল্যাব,সেন্টার রিসার্চ ইনস্টিটিউট, পাস্তুর ইনস্টিটিউটকে এতদিন বসিয়ে রেখেছে কেন্দ্রীয় সরকার।যেসব রাষ্ট্রায়ত্ব সংস্থা স্বাধীনতার পর থেকে ৭০ বছরের বেশীদিন ধরে টিকা উৎপাদন করেছে তাদের বাদ দিয়ে দুটি মাত্র বেসরকারি সংস্থাকে টিকার বরাত দেওয়াতে প্রশ্ন উঠতে আরম্ভ করেছে।
২০০৪ সালে জাবিদ চৌধুরী কমিটির রিপোর্টে সিআরআই, পিআইআই, বিসিকিভিএল পুনরুজ্জীবনের পক্ষে সুপারিশ করেছিল।

রিপোর্টে দেখানো হয়েছিল ২০০৮-০৯ ও ২০০৯-১০ অর্থবর্ষে দেশে বিভিন্ন টিকার দাম ৩০ থেকে ৬৩ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গিয়েছিল এই রাষ্ট্রায়ত্ব সংস্থাগুলি বন্ধ হওয়ার জন্য।

সেন্ত্রাল ভিস্তাকে অত্যাবশ্যকীয় কাজের তকমা

অতিমারীর কারণে সারা দেশে যখন মানুষ চরম বিপর্যয়ের সন্মুখীন, দেশের সব জায়গায় হাসপাতালে বেড পাওয়া যাচ্চে না, অক্সিজেনের অভাবে মৃত্যু মিছিল,চিকিৎসা ব্যাবস্থা ভেঙে পড়েছে বলে অভিমত খোদ ডাক্টারদের,রাজধানীর বাসিন্দারা দিশেহারা, নাইন কার্ফু জারি হয়েছে, বস্তুতঃ দেশে এখন অঘোষিত জরুরি অবস্থা চলছে তখন কেন্দ্রীয় সরকার ২০০০০ কোটি টাকার মোদীর স্বপ্নের প্রকল্প সেন্ত্রাল ভিস্তা প্রকল্পকে অত্যাবশ্যকীয় পরিষেবার তকমা দিয়ে একাধিক শিফটে চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে।১৬ এপ্রিল সিপিডব্লুডি দিল্লী পুলিশকে জানিয়েছে যেহেতু এবছরের নভেম্বরের মধ্যে এই প্রকল্পের কাজ শেষ করতে হবে তাই নির্মাণকারী সংস্থাকে তিনটি শিফটে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তার মানে দেশে যত বড় বিপর্যয় হোক না কেন মোদীর অহমিকা তৃপ্তির জন্য এই অহেতুক খরচ ও কাজ চলবে।উল্লেখ্য যে এই টাকায় ১৮-৪৫ বছরের প্রত্যেকে বিনাপয়সায় টিকা পেত।রাহুল গান্ধির বক্তব্য, সেন্ত্রাল ভিস্তা আবশ্যিক নয়।অত্যাবশ্যক হল কেন্দ্রে দূরদৃষ্টি সম্পন্ন সরকার। ঠিকই বলেছেন তিনি মোদীদের কে বোঝাবে ছাত্র যুবরা দেশের মেরুদন্ড।অর্থনীতির স্বার্থেই এদের সুস্থ রাখা দরকার।

মোদীর সাথে রাহুলের তফাৎ

রাহুল গান্ধিকে যতই বিজেপি নেতা বা ভক্তরা পাপ্পু বলে ব্যঙ্গ করুক না কেন,দেশের একশ্রেণির মানুষ কিন্তু এখন তার সাথে মোদীর তুলনা টানতে আরম্ভ করেছেন।তাঁরা রাহুলের গত একবছরের বক্তব্য ও কাজ পর্যালোচনা করতে শুরু করেছেন।দেখা যাক রাহুলের গত একবছরের কাজকর্ম।

১২ ফেব্রুয়ারি ২০২০ঃ রাহুলের বক্তব্য ছিল মানুষ ও অর্থনীতির ওপর কোবিদ এক জরুরি ভীতি যা সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে না।তখন দেশে মাত্র তিনজন রোগী পাওয়া গিয়েছিল।

২৬ মার্চ ২০২০ঃ দেশে তখন ৭৩০ জন করোনা আক্রান্তর খবর পাওয়া গিয়েছে তখন রাহুল বলেছিলেন লকডাউন করেনাকে পরাস্ত করতে পারবে না,পরীক্ষা বাড়ান।

১৪ আগষ্ট ২০২০ঃ দেশে করেনা আক্রান্ত পৌঁছে গেছে ২৫ লাখে তখন তিনি বলেন প্রতিষেধক বেরলেই তা পাবার সুবন্দোবস্ত করা দরকার।
১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১ঃ দেশে করোনা আক্রান্ত যখন ১.১ কোটি তখন প্রধানমন্ত্রী ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী বিভিন্ন জায়গায় বলে বেড়াচ্ছিলেন করোনা পালিয়ে গিয়েছে তখন রাহুল বলেছিলেন করোনা ভাইরাস এখনো শেষ হয়ে যায় নি।

১৮ এপ্রিল ২০২১ঃ বাংলায় তখন মোদী,শাহ্,নড্ডা ডেলিপ্যাসেঞ্জারি করে নির্বাচনী প্রচার করে বেড়াচ্ছেন, তখন মাত্র দুটি সভা করে সবরকম সমাবেশ বাতিল করলেন রাহুল। তখন দেশে আক্রান্তর সংখ্যা দেড় কোটি।
২৫ এপ্রিল ২০২১ঃ বিভিন্ন রাজ্যের বিজেপি নেতাদের বিরুদ্ধে যখন বিরোধীরা করোনার ইন্জেকশন,ওষুধ ও অক্সিজেন সিলিন্ডার কালোবাজারির অভিযোগ করছেন তখন রাহুল তাঁর সব সহকর্মীদের সমস্ত রাজনৈতিক কাজ বাতিল করে মানুষের পাশে দাঁড়াতে নির্দেশে দেন।বলেন এটাই আমাদের ধর্ম। যদিও যুব কংগ্রেস সারা ভারতে এক বিশাল কর্মযজ্ঞ করে সারা দেশের কেরোনা আক্রান্ত মানুষদের কিছুটা সাহায্য করতে পেরেছেন।এখানে বিজেপি মারাত্মকভাবে পেছিয়ে পড়েছে।

গত বছর রাহুল বলেছিলেন যে করোনার সুনামী আসতে চলেছে।কেন্দ্রের উচিৎ এখনই উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া।মোদী হর্ষবর্ধনেরা হেসে উড়িয়ে দিয়েছিলেন এবং ব্যঙ্গ করেছিলেম।আর এখন দিল্লী হাইকোর্ট বলল এটা ওয়েভ নয় সুনামী।কি বলবেন এই জোকারদের?

করোনা মহামারীর সময় রাহুলকে দেখেছি দেশ বিদেশের বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক,গবেষক, অর্থনীতিবিদ্ দের সাথে বার বার আলোচনা করে সরকারকে পরামর্শ দিচ্ছেন। আর সরকার তা গ্রহন করছে না শুধুমাত্র নিজের ইগো ধরে রাখতে গিয়ে।রাহুল বার বার দরিদ্র মানুষকে মাসে একটা অর্থ দেওয়ার কথা বলেছিলেন যা বিভিন্ন দেশে দেওয়া হয়েছে এবং বিশ্বের একাধিক সমাজবিজ্ঞানী ও অর্থনীতিবিদ্ তা বার বার তাদের নিবন্ধে লিখেছেন বা বলেছেন।কিন্তু এই অকর্মণ্য ও মানবতার শত্রুদের শয়তান ছাড়া কে বোঝাবে।

৭০ বছরে এই প্রথমবার জীবিতদের জন্য হাসপাতাল ও অক্সিজেন ও মৃতদের জন্য শ্মশানে জায়গা নেই।নেই কবরে মাটি খোঁড়ার লোক।নেই প্রতিষেধক। নেহেরু – ইন্দিরা- মনমোহন এর সময় যদি এই অব্যবস্থা থাকতো তাহলে ঘরে ঘরে বিনাপয়সায় স্মল পক্স বা পোলিওর প্রতিষেধক পৌঁছাতো না।সেক্ষেত্রে হয়ত দেখা যেত দেশের বেশীরভাগ মানুষই বিকলাঙ্গ। দেশে যখন ভয়াবহ সঙ্কট চলছে তখন আর এস এস মিডিয়াকে নির্দেশ দিল শুধুমাত্র পজেটিভ খবর যেন দেখান হয়।উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী অজয় বিস্ত বা জোগী আদিত্যনাথ সরকারের সমালোচনা করলে সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হবে বলে হুমকি দিলেন।নতুন নিয়ম জারি করলেন যে হাসপাতালে ভর্তি হতে গেলে মূখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিকের চিঠি লাগবে।আবার আগ্রার ১০ টি হাসপাতালের ১০০০ জন রোগীকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় অক্সিজেনের অভাবে। টুইটরকে বলা হয় কোভিদ মোকাবিলায় সরকারের ভূমিকাসংক্রান্ত সবরকম টুইট মুছে ফেলতে। সরকারের পক্ষ থেকে মিডিয়াকে এও বলা হয় বর্তমান সমস্যার জন্য সরকারকে নয় সিস্টেমকে দায়ী করতে। গুজরাটের হাসপাতালে হিন্দু ও মুসলীমদের আলাদা ওয়ার্ডে রাখা নিয়ে সারা দেশ স্তম্ভিত।
বিশ্বের বিশিষ্ট সংবাদমাধ্যম যেমন নিউ ইয়র্ক টাইমস ইত্যাদি মোদী সরকারের কোবিদ নীতি ও বর্তমান ভারতের দূরাবস্থা নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছে।বৃটেনের গার্ডিয়ন সংবাদপত্রে সম্পাদকীয়তে লিখেছেন যে ভারত নরকে পরিণত হয়েছে।এজন্য তারা কুম্ভ মেলা থেকে মোদীর একের পর এক বড় সভা করাকে দায়ী করেছে।তারা প্রশ্ন তুলেছে এইঅবস্থায় কেন আইপিএল প্রতিযোগীতা চলছে,এমন কি দর্শকপূর্ণ স্টেডিয়ামে।তাছাড়া মোদীর নিজের ওপর অতিরিক্ত আস্থাও অন্যতম কারণ হিসাবে দেখিয়েছে।সরকার যে অপদার্থতার প্রশ্নে প্রথম সারিতে তাও কোন কোন সংবাদপত্র লিখেছে।

সম্প্রতি রাহুল গান্ধী নির্দেশ দিয়েছেন যে সব রাজনৈতিক ক্রিয়াকলাপ বন্ধ রেখে দেশের সমস্ত কংগ্রেস কর্মীকে তাদের রাজ্যে করোনা আক্রান্তদের সাহায্য করার জন্য ওয়ার রুম খুলে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে।সর্বভারতীয় যুব কংগ্রেসের সভাপতি শ্রীনিবাসনের নেতৃত্বে বেশ কিছুদিন ধরে সারা দেশের বিভিন্ন রাজ্যে তারা অসংখ্য মানুষকে সাহায্য করে দেশের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। পশ্চিমবঙ্গেও প্রদেশ কংগ্রেসের ওয়ার রুম করোনা রোগীদের সহায়তা করতে আরম্ভ করেছে। প্রদেশের সহ সভাপতি দিপ্তিমান ঘোষের নেতৃত্বে( চেয়ারম্যান) ও সুমন পালের( আহ্বায়ক) উদ্যোগে ইতিমধ্যে বেশ কিছু রোগীদের পাশে দাঁড়ানো ও তাদের ওষুধপত্র দেওয়া হয়েছে। এই কমিটিতে সদস্য হিসাবে আছেন কান্তনু কুন্ডু,সাইমা জাভেদ, উর্বশী চ্যাটার্জী।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published.