ডেলোর মিটিংয়ে কি হয়েছিলো?

–পার্থ মুখোপাধ্যায়ঃ

বাংলায় একটা প্রবাদ প্রচলিত ছিলো “লাগে টাকা, দেবে গৌরী সেন”। কালের নিয়মে সময় যেমন বদলায়, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সময়ের পরিচিতির আনুষাঙ্গিকতাও বদলায়। ২০১১য় পশ্চিম বাংলায় রাজনৈতিক পরিবর্তনের হাত ধরেও সময়ের তালে তাল দিয়ে যা ছিলো প্রবাদ, তারই আজ ফলিত বিকৃত এবং বিক্রিত রূপ দেখি, যখন প্রবাদের চরিত্র বদলে ফলিত বাস্তব চরিত্রের উদয় ঘটে, অর্থাৎ যা ছিলো প্রবাদ ” লাগে টাকা দেবে গৌরী সেন” তারই আজ ফলিত বাস্তব রূপ হলো “লাগে টাকা দেবে সুদীপ্ত সেন”!!!

পরিবর্তন আরও আছে। প্রবাদের গৌরী সেন দিতেন নিজের উপার্জনের টাকা, আর বর্তমান বাস্তবের সুদীপ্ত সেন দিয়েছেন পরান মন্ডল, হারু শেখদের মতো জীবনের সর্বস্ব আয় ও জমানো শেষ স্বম্বল পুঁজিটুকু, যারা সুদীপ্ত সেনের প্রতি তৃনমূলের বিভিন্ন নেতৃবৃন্দের সমর্থনকে সুকৌশলে রাজ্য সরকারের নিশ্চয়তার বরাভয় হিসেবে বোঝানো কে বিশ্বাস করে ঠকেছিলেন।

তফাৎ কি শুধু এইটুকুই? না, গৌরী সেনের টাকা বিলোনো সমাজে গরীব মানুষদের উপকার করেছে, জন্ম দিয়েছে প্রবাদের আর অভিযোগের। কি সেই অভিযোগ? অভিযোগ হলো– সুদীপ্ত সেন গরীব মানুষদের নয়, টাকা দিয়েছেন তৃনমূলের বিভিন্ন নেতাদের। এরফলে গরীব মানুষদের টাকা মার গেছে। ফলে গৌরী সেনের দান জন্ম দিয়েছে প্রবাদের, আর তৃনমূলের ছত্রছায়ায় থাকা সুদীপ্ত সেনের ব্যবসায়িক ও রাজনৈতিক স্বার্থ স্বমন্বিত টাকা ছড়ানো জন্ম দিয়েছে গরীব মানুষের বিলাপের।

সব শুরুর যেমন একটা শুরু আছে, এই জালিয়াতিরও শুরু আছে। দার্জিলিঙয়ের সেই ডেলো পাহাড়ের আড্ডাটা যে বাস্তব, তা নিয়ে আজ আর কোনো সংশয় নেই, কেননা সংশ্লিষ্ট কোনো পক্ষই এই ডেলো পাহাড়ের ঘটনাটা অস্বীকার করতে পারেননি। এই মিটিংয়ে বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী সমেত তৃনমূলের তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতৃত্বের উপস্থিতিরই অভিযোগ। সুদীপ্ত সেন তৃনমূল নেতাদেরই শুধু টাকা দেননি, তৃনমূলের কোনো কোনো নেতা আবার টাকা দেওয়ারও অপেক্ষা করেননি। তারা নাকি বস্তা বস্তা টাকা তুলে নিয়েও চলে গেছেন বলে অভিযোগ। এমনকি এই সব তৃনমূলী নেতৃবৃন্দের সুদীপ্ত সেনের সারদার অফিসে যাতায়াতেরও নাকি প্রমান সিসি টিভিতে বন্দি বলে অভিযোগ শোনা যায়।

এতোদূর পর্যন্ত ঘটনার গতি প্রকৃতি এক রকম এগোচ্ছিলো। হঠাৎই তাতে কিছু নতুন মশলা দিলেন গরীব ও মধ্যবিত্ত মানুষের কয়েকশো কোটি টাকা মারায় অভিযুক্ত সুদীপ্ত সেন। রীতিমতো সংবাদিক সম্মেলনের মতো করে তিনি সিবিআইকে লেখা তার এক চিঠির উল্লেখ করলেন, যাতে নাকি তিনি রাজ্য কংগ্রেস সভাপতি ও লোকসভায় কংগ্রেসের দলনেতা অধীর রঞ্জন চৌধুরীর নামোল্লেখ করেছেন।

রাজ্য রাজনীতির খবরা খবর রাখেন, এমন ওয়াকিবহাল মহলের মত এবার হয়তো সুদীপ্ত সেনের জামিনের ব্যবস্থা তৃনমূল সরকার ভাবতে পারেন, আর তাই তারই পারিপার্শ্বিক প্রস্তুতির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তাঁদের আরও অভিমত এই উদ্যোগেরই অংশ হিসাবে অধীর রঞ্জন চৌধুরীকেও কালিমালিপ্ত করার সুনিয়োজিত প্রয়াস চলছে সুদীপ্ত সেনের মাধ্যমে এবং তৃনমূলের নিয়ন্ত্রিত পরিচালনায়।

আমরা জানি ইতিমধ্যেই অনেকবার তৃনমূল কংগ্রেসের প্রধান সরকারি মুখপাত্র দাবি করেছেন এই সারদা কেলেংকারীর কারন তৃনমূলেরই বিভিন্ন নেতৃবৃন্দের লোভ ও সীমাহীন আর্থিক সুবিধা ভোগ, যা সারদা নামক আর্থিক প্রতিষ্ঠানটিকে ক্রমশই দুর্বল করেছে। এমনকি দুর্বল ও মধ্যবিত্ত মানুষদের আর্থিক ক্ষতির কথাও তৃনমূলের নেতৃবৃন্দ আমল দেননি, এমনই অভিমত বিভিন্ন সময়ে দিয়েছেন তৃনমূল মুখপাত্র। সর্বপরি, তাঁর উচ্চ কন্ঠে এই অভিযোগও একসময় শোনা গেছে যে সারদা কেলেংকারীর গরীব ও মধ্যবিত্ত মানুষদের টাকা মারার সবচেয়ে বেশি সুফল পেয়েছেন তাদের সর্বোচ্চ নেত্রী ও বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী। ঠিক এই সব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতেই প্রশ্ন জাগে ডেলোর মিটিংএ কি কি আলোচনা এবং সিদ্ধান্ত হয়েছিলো। এই গভীর রহস্য ভেদের সময়ও অতিক্রান্ত হতে চলেছে, অথচ কি এক অমোঘ দুর্লঙ্ঘতা সিবিআইকেও গ্রাস করেছে, তা অনুমেয়।

পরিশেষে আইনি প্রশ্ন উঠছে কি করে সুদীপ্ত সেনের মতো একজন দাগী অভিযুক্ত আসামি প্রায় সাংবাদিক সম্মেলনের জমাটি আসর বসাতে পারেন এবং একটি বিচারাধীন বিষয় সংক্রান্ত মামলার ক্ষেত্রে তথাকথিত গোপন তথ্য আলোচনা করতে পারেন। এই দুটিই ফৌজদারী দন্ডবিধির আওতায় গুরুতর অপরাধ সাব্যস্থ হওয়ার যোগ্য।

পরিশেষে, অধীর রঞ্জন চৌধুরী তার নাম উল্লেখের পরিপ্রেক্ষিতে খোলা চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন যে দাগী অভিযুক্ত সুদীপ্ত সেন, মুখ্যমন্ত্রী, তৃনমূল মুখপাত্র সহ সিট, সিআইডি, ইডি, সিবিআই সমেত যতগুলি তদন্ত সংস্থা আছে, তাদের সম্মুখে এনাদের সঙ্গে তাঁকেও ডাকা হোক এবং ডেলোর মিটিং নিয়েও আলোচনা হোক, সেখানে ঠিক কি কি বিষয়ে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত হয়েছে, যা এই মূহুর্তে জানা অত্যন্ত জরুরি। সারদা কান্ডের সমস্ত জট লুকিয়ে আছে ঐ শুরুর শুরু ডেলো পাহাড়ের মিটিংয়ে!!!

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published.