পেট্রোল-ডিজেলের মূল্য বৃদ্ধিঃ কেন্দ্র-রাজ্য কেউই দায় এড়াতে পারে না

-পার্থ মুখোপাধ্যায়ঃ

মোদি সরকারের আট বছর সঙ্ঘীয় হিন্দুত্ববাদীদের বেশ সুখের সময় হলেও সার্বিক অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং ভারত চিন্তার বিচারে আসলে তা এক পৌনঃপৌনিক ব্যর্থতার দগদগে ঘায়ের মতো । বিশেষ করে সার্বিক অর্থনৈতিক ব্যার্থতা যেন যুগপৎ একের পর এক ক্ষতিকারক অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তগুলির প্রতিবিম্ব হয়ে প্রতিভাত হচ্ছে যা মোদী সরকারের সার্বিক ব্যর্থতারই সমার্থক। মোদী সরকার গত ৮ বছরে ভারতবর্ষকে এক চরম বিপদের মধ্যে ফেলেছে। নির্ভাজাল সঙ্ঘীয় চেনা রাজনীতির পথে হেঁটেই সাধারণ মানুষের জীবন ও জীবিকার দৈনন্দিন মূল সমস্যা গুলি থেকে দৃষ্টি ঘোরাতে নানা রাজনৈতিক ও সামাজিক অনুষঙ্গের মতো বিজেপি দল নানা রকমের বিভেদের বীজ বপন করছে, যা তাদের নির্বাচনী সুফলও দিয়ে চলেছে, তাই তারা এইসব সমস্যাগুলির ব্যাপারে ভাবলেশহীন। এই মূহুর্তে দেশের সাধারণ মানুষের জীবন ও জীবিকার সামনে যখন বিরাট প্রশ্ন চিন্হ, তখন বিজেপি, সরকার ও রাষ্ট্রীয় মিডিয়া মন্দির বা মসজিদের ভেতরে কি পাওয়া যেতে পারে, তাই নিয়েই ব্যাস্ত অথচ যে সত্য বা সমস্যাকে আড়াল করা হচ্ছে সেইগুলি যাতে নাগরিক পরিসরে না থাকে তার লাগাতার প্রয়াস চলছে। প্রধানতম এমন সমস্যা হলো নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম, বিশেষ করে খাদ্য শস্য, আনাজপাতির দাম যা আজ আকাশ ছোঁয়া এবং গরীব ও মধ্যবিত্তের ক্রমশ নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। এই মূল সমস্যার প্রতিফলন আমরা সরাসরি দেখতে পাই সরকারি সংখ্যাতত্বেই যেখানে খুচরো মূল্য সূচকে মুদ্রাস্ফীতির হার এই সময়ে গত ৮ বছরের সর্বাধিক ৮ শতাংশ ছুঁয়েছে। এমনকি পাইকারি মূল্য সূচক ১৫ শতাংশেরও বেশি হয়েছে। এই ডবল ডিজিট বা দুই অঙ্কের পাইকারি মূল্য সূচক আজ বলে নয়, গত ১৩ মাস লাগাতার বজায় রয়েছে। অর্থনীতির সাধারন জ্ঞানের সহজবোধ্য উপলব্ধি যে সাধারন ও গরীব মানুষ কি অবর্ণনীয় দূর্দশার মধ্যে দিয়ে চলেছে।

কিন্তু এই পরিস্থিতির উদ্ভব হওয়ার কারন কি? প্রধান কারন ২০১৪ সালে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকার ক্ষমতা ছেড়ে যাওয়ার পর পেট্রোল ও ডিজেলের ওপর গত ৮ বছরে যথাক্রমে ৩৫০ শতাংশ এবং ৯০০ শতাংশ পর্যন্ত কর ও উৎপাদন শুল্ক বৃদ্ধি পেয়েছে। এই বৃদ্ধি ঘটেছে অনেকটাই মোদী সরকারের দ্বারা এবং অবশ্যই বাকিটা রাজ্য সরকারগুলির মাধ্যমে। এই সব বৃদ্ধির উপর্যুপরি ফলাফল সাধারন মানুষের ঘাড়েই চাপছে। মোদী সরকারের হঠকারী অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের কারনে জিজেলের ওপরেও লাগাম ছাড়া কর ও শুল্ক আরোপ হয়েছে। কংগ্রেসের বা তার নেতৃত্বাধীন সরকারগুলি ডিজেলের ওপর কম কর বা শুল্ক আরোপ করতো। এর প্রধান কারন ছিলো আমাদের দেশে মোট ব্যবহ্রত ডিজেলর অর্ধেকই কেন্দ্র এবং রাজ্য সরকারগুলি ব্যবহার করে। গণপরিবহনের ক্ষেত্রে, যা মোটামুটি বেশিরভাগই সরকারি, তা ডিজেলেই চলে। এছাড়াও চাষের কাজে প্রয়োজনীয় ডিজেলের ওপর সরকারি ভর্তুকির পরিমানও বিশাল। ফলে ডিজেলের অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধি সরাসরি সরকারি কোষাগারেও বিরাট প্রভাব ফেলে। বর্তমান মোদী সরকার অবশ্য এসব নিয়ে আদৌ ভাবিত নয়, তারা সোজা রাস্তা বোঝে এবং বর্ধিত চাপ সরাসরি জনগনের ঘাড়েই চাপিয়ে দিচ্ছে। এছাড়াও খাদ্যশস্য সমেত নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি ডিজেল চালিত পরিবহনের মাধ্যমেই সরবরাহ হয়। এর ফলেও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির সরাসরি দায় সেই জনগনের ওপরেই এসে পড়ে যখন ডিজেলের বর্ধিত দাম খাদ্যশস্য ও নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের দামে যুক্ত হয়।

কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ, দুই প্রকার করই বলবৎ করার সাংবিধানিক অধিকার আছে, কিন্তু রাজ্য সরকারগুলির হাতে শুধুমাত্র পরোক্ষ কর আরোপের অধিকার আছে। এই সীমিত অধিকার রাজ্যগুলির সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে দেয় যখন কেন্দ্র রাজ্যগুলিকে তাদের সাংবিধানিক অধিকার সম্মত করের ভাগ দেয়না বা দিতে বিলম্ব করে। শুধু বর্তমান নয়, ভবিষ্যতের জন্যেও আরও একটি বড় সমস্যা মোদী সরকার সৃষ্টি করছে। কংগেস নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে আমাদের পেট্রল ও ডিজেলের মোট প্রয়োজনের ২৩ শতাংশ দেশেই উৎপাদন হতো, যা আজ কমিয়ে মোদী সরকার ১৫ শতাংশ করেছে। অভিযোগ যে ওএনজিসির মতো সরকারি ক্ষেত্রকে এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ক্রমান্বয়ে দূর্বল করার, যার আসল কারন তার ভ্যালুয়েশনের অবনমন ঘটানো যাতে নাকি পরবর্তীকালে তার সব সম্পত্তি সমেত সম্ভাব্য বাজার দরের অনেক কম দামে রিলায়েন্সের হাতে তুলে দেওয়া য়ায়। একই প্রক্রিয়া আমরা জীবন বীমা নিগমের ক্ষেত্রে ইতিমধ্যেই দেখেছি।

বিজেপির প্রচার যন্ত্র এই দাম বাড়ার প্রেক্ষিতে অনেক মিথ্যার সঙ্গে আরও একটি মিথ্যাকে প্রতিনিয়ত প্রচার করে চলেছে। এই প্রচারের মূল উপজীব্য হলো ২০১৪র পূর্বের ইস্যু কর ১.৩১ লক্ষ কোটি টাকার অয়ল বন্ড, যা সুদ সমেত ১.৬৮ লক্ষ কোটি টাকার দায় ২০২৬ সাল থেকে পরিশোধযোগ্য। বিজেপি প্রচার যন্ত্রের মতে এই দায় মেটানোর জন্যই নাকি সরকার পেট্রোপণ্যের দাম বাড়াতে বাধ্য হচ্ছে। যে সত্যকে চেপে যাওয়া হচ্ছে, তা হলো গত ৮ বছরে সরকার পেট্রোপণ্যের ওপর ট্যাক্স এবং শুল্ক বাবদ অতিরিক্ত ২৬.৫১ হাজার লক্ষ কোটি টাকা অতিরিক্ত আদায় করেছে সাধারন মানুষের কাছ থেকে, যা মাসের হিসেবে দাঁড়ায় প্রতি পরিবার পিছু ১০৫০ টাকার মতো। কেন্দ্রীয় সরকার এই বর্ধিত খাতে অন্তত যে ২৬.৫১ লক্ষ কোটি এই বছর পর্যন্ত অতিরিক্ত আয় করেছে, তা মোট দায় ১.৬৮ লক্ষ কোটি টাকার থেকে অন্তত ১৬/১৭ গুন বেশি। ফলে, এই প্রেক্ষিতে বিজেপির নির্জলা মিথ্যা দিনের আলোর মতো প্রতীয়মান।

পরিশেষে, এটাই সাধারন দাবি যে সরকার পেট্রেপণ্যের ওপরঅযাচিত বর্ধিত চাপ কমিয়ে সাধারণ মানুষের ওপর অর্থনৈতিক চাপ কমিয়ে কিছু সুবিধা দেয় যাতে দ্রব্যমূল্যের দামে কিছু নিয়ন্ত্রন থাকে এবং সাধারন মানুষের ওপর অবর্ণণীয় অর্থনৈতিক চাপের কিছুটা অন্তত সুরাহা হয়। বর্তমান অসহনীয় অবস্থা থেকে বেরোনোর একমাত্র উপায় পেট্রোপণ্যের ওপর সরকারি কর ও শুল্ক কমানো। এই দায় শুধুমাত্র কেন্দ্রীয় সরকারেরই ওপর বর্তায়না, রাজ্য সরকারের ওপরেও দায়িত্ব বর্তায়। এটা ঘটনা যে কেন্দ্রীয় সরকার রাজ্যের সাংবিধানিক হকের টাকা দিচ্ছেনা, কিন্তু তা কখনই জনগনের প্রতি রাজ্যের দায়কেও অস্বীকারের অজুহাত করে পারে না। সরাসরি করের সরাসরি ছাড় না দিতে পারলেও, রাজ্য সরকার কেন্দ্রের ক্রমবর্ধিত হারে আরোপিত করের ওপর রাজ্যের বাড়তি পাওনার ওপর অতিরিক্ত আয়কে ছাড় দিতেই পারে, যা নির্ভর করছে একান্তই রাজ্য সরকারের সদিচ্ছার ওপর।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published.