আগস্ট বিপ্লবে মেদিনীপুর জেলার তমলুক ও কাঁথি মহকুমার ঐতিহাসিক ভূমিকা ।

আগস্ট আন্দোলন শুরু হওয়া মাত্র এই জেলার কংগ্রেস নেতৃবৃন্দ আত্মগোপন করেন।সুনিপুণ সংগঠন গড়ে তুলে হাজার হাজার জনসাধারণ কে নিয়ে তাঁরা ২৯ শে সেপ্টেম্বর তমলুক ও কাঁথি মহকুমার প্রতিটি থানা অভিযান করেন।নিরস্ত্র জনতার ওপর গুলিবর্ষণের ফলে প্রায় দুইশত মানুষ নিহত হন।কিন্তু তা সত্ত্বেও তমলুক ও কাঁথি মহকুমার প্রতিটি থানা সাধারণ মানুষ দখল করে নেন।ব্রিটিশ শাসনের বিলুপ্তি ঘটে।ওই দিনই তমলুকে শহিদ হন অশীতিপর বৃদ্ধা মাতঙ্গিনী হাজরা।

কিন্তু ১০ অকটোবর , ১৯৪২ এক ভয়াবহ সাইক্লোনের ফলে সামগ্রিক ভাবে মেদিনীপুর জেলা ও বিশেষ করে কাঁথি ও তমলুক মহকুমা বিধ্বস্ত হয়ে যায়।এই সুযোগে পুলিশ ও মিলিটারি বিভিন্ন এলাকায় ঢুকে পড়ে ও ভয়াবহ অত্যাচার শুরু করে। বহু মহিলা ধর্ষিত হন।বাধ্য হয়ে আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ পাল্টা হিংসাত্মক আক্রমণের পথ গ্রহণ করেন।

১৯৪২ এর ডিসেম্বর মাসে গঠিত হয় মহা ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রের তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকার।এই সরকারের সর্বাধিনায়ক নির্বাচিত হন সতীশ চন্দ্র সামন্ত।অন্যান্য নেতৃবৃন্দ ছিলেন অজয়কুমার মুখোপাধ্যায়, রজনীকান্ত প্রামানিক প্রমুখ ব্যক্তিগণ।সরকারের সেনা বিদ্যুৎ বাহিনীর সেনাপতি ছিলেন সুশীলকুমার ধারা।প্রায় তিন বছর তমলুকে ব্রিটিশ শাসন অস্তিত্বহীন হয়ে পড়ে।১৯৪৫ সালের ডিসেম্বর মাসে গান্ধিজি তমলুক ও কাঁথির জনসাধারণকে অভিনন্দিত করার জন্য মেদিনীপুরে আসেন।তাঁর কাছে কিছু ব্রিটিশের খয়ের খাঁ জমিদার অভিযোগ করে যে সতীশ সামন্ত ও তাঁর অনুগামীরা চরম হিংসার আশ্রয় নিয়েছেন। গান্ধিজি সতীশ সামন্তের কাছে এই অভিযোগের সত্যাসত্য সম্পর্কে জানতে চান।সতীশ সামন্ত তাঁকে বলেন বিপন্ন নারীদের রক্ষার জন্য তাঁরা হিংসার পথ গ্রহণ করেছিলেন। গান্ধিজি জানতে চান সেই অত্যাচারিত নারীরা এখন কোথায় ? সতীশ সামন্ত তাঁকে জানান এই নারীরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ বাড়িতে আছেন। সমাজ কাউকে ত্যাগ করেনি। গান্ধিজি ডা. সুশীল নায়ার ও আভা গান্ধিকে গ্রামে গ্রামে ঘুরে এই অত্যাচারিত নারীদের কথা শুনবার জন্য নির্দেশ দেন।

ডা.সুশিলা নায়ার তাঁর ‘Satish Samanta Da–the Gandhian’ গ্রন্থে লিখেছেন তাঁরা ফিরে এসে বাপুর কাছে কেঁদে ভাসালেন।’সতীশ দা সব হিংসাত্মক ঘটনার দায়িত্ব স্বীকার করে বলেন, ‘ বাপু আপনি নির্দেশ দিলে আমরা ব্রিটিশ সরকারের কাছে স্বীকারোক্তি দিয়ে শাস্তি গ্রহণে রাজি আছি ‘।উত্তরে গান্ধিজি বলেন ‘Am I an agent of British Government? যে সরকার তোমাদের বিরুদ্ধে আজও কোনও মামলা প্রমাণ করতে পারেনি,তোমাদের স্বীকারোক্তি দিতে বলে আমি তাদের সাহায্য করতে যাবো কেন ?’

২৯ ডিসেম্বর , ১৯৪৫ এ মহিষাদলে বিশাল প্রার্থনা সভায় গান্ধিজি বলেন ” আমি বরাবর বলেছি– কাপুরুষতার চেয়ে হিংসা শ্রেয়।যদি অহিংস পন্থায় মা বোনের সম্মান রক্ষা করতে অপারগ হও-তবে হিংসার আশ্রয় গ্রহণ করো-কাপুরুষের মত পালিয়ে যেওনা।সতীশের নেতৃত্বে তমলুকের কংগ্রেস কর্মীরা ত্যাগ ও বীরত্বের যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে আমি তার প্রশংসা করি (‘ তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকার’–লেখক রাধাকৃষ্ণ বাড়ি,সরকারের মুখপত্র ‘বিপ্লবী’র সম্পাদক,পৃ.- ২৮৮-২৮৯)”।

৩০ ডিসেম্বর,১৯৪৫ আনন্দবাজার পত্রিকায় লেখা হয় ‘তমলুক মহকুমার অধিবাসীগণকে তাঁহাদের সহিষ্ণুতা ও সাহসের জন্য অভিনন্দিত করিয়া গান্ধীজি বলেন–সম্ভবত: অহিংসার তাৎপর্য সম্পর্কে আপনাদের কাহারও কাহারও মনে ভ্রান্ত ধারণা রহিয়াছে ‘।

এই হচ্ছে ভারত ছাড়ো আন্দোলন,হিংসা অহিংসা সম্পর্কে গান্ধীজির ভূমিকা।

নেতাজির সমর্থন

নেতাজি ওইসময় বার্লিনে ছিলেন।তিনি সেখান থেকে আগস্ট আন্দোলনকে পরিপূর্ণ সমর্থন জানান।১৯৪৩ এর আগস্টে তিনি সাবমেরিনে করে দীর্ঘ বিপদসংকুল সমুদ্রপথ অতিক্রম করে জাপানে আসেন।তিনি বিপ্লবী রাসবিহারী বসুর কাছ থেকে আজাদ হিন্দ ফৌজের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।এর পরই ১৯৪৩ এর অকটোবৱে তিনি সিঙ্গাপুরে আজাদ হিন্দ সরকার গঠন করেন।আজাদ হিন্দ সেনা বাহিনীর চারটি ব্রিগেডের নামকরণ করেন গান্ধি ব্রিগেড, সুভাষ ব্রিগেড , জওহর ব্রিগেড ও মৌলানা আজাদ ব্রিগেড।১৯৪৪ সালের ২ রা অকটোবর গান্ধিজির জন্মদিনে আজাদ হিন্দ বেতার থেকে প্রচারিত ভাষণে সুভাষচন্দ্র তাঁকে

‘ জাতির জনক ‘ বলে সম্বোধন করেন।

সাম্প্রদায়িক শক্তির ভূমিকাআগস্ট

আন্দোলনে কোনও সম্প্রদায় ভিত্তিক দল যোগ দেয়নি।মুসলিম লিগ, হিন্দু মহাসভা ও রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ, এরা এই সংগ্রামে যোগ দেয়নি।সাভারকর ও গোলওয়ালকর নির্দেশিত পথে হিন্দু মহাসভাও আর.এস.এস ওই সময় ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে হিন্দু যুবকদের যোগ দেওয়ার জন্য প্রচার চালাচ্ছিল।হিন্দু মহাসভার সর্ব ভারতীয় সভাপতি তখন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়।তিনি ওই সময় বাংলায় ফজলুল হকের সঙ্গে জোট গঠন করে মন্ত্রীত্ব করছিলেন।মনে রাখতে হবে ভারতবাসীর মতামত না নিয়ে বিশ্বযুদ্ধে ভারবাসীকে জড়িয়ে দেওয়ার যে ঘোষণা বড়লাট লিনলিথগো করেছিলেন, তার প্রতিবাদে ৮ টি রাজ্যের কংগ্রেস সরকার পদত্যাগ করে।কংগ্রেসের স্লোগান ছিল যুদ্ধে ‘ না এক ভাই , না এক পাই ‘ ।

এই সুযোগে হিন্দু মহাসভা ও মুসলিম লীগ সিন্ধ ও উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে কোয়ালিশন সরকার গঠন করে।

যাই হোক শ্যামাপ্রসাদ ২৬ জুলাই ,১৯৪২ তারিখে বাংলার গভর্নর জন আর্থার হারবার্ট কে চিঠি দিয়ে বলেন আগস্ট আন্দোলনের বিরুদ্ধে তাঁরা সরকারের সঙ্গে পূর্ণ সহযোগিতা করবেন।তিনি লেখেন:–

The question is how to combat this movement (Quit India) in Bengal? The administration of the province should be carried on in such a manner that in spite of the best efforts of the Congress, this movement will fail to take root in the province. It should be possible for us, especially responsible Ministers, to be able to tell the public that the freedom for which the Congress has started the movement, already belongs to the representatives of the people. In some spheres, it might be limited during the emergency. Indians have to trust the British, not for the sake for Britain, not for any advantage that the British might gain, but for the maintenance of the defense and freedom of the of the province itself. You, as Governor, will function as the constitutional head of the province and will be guided entirely on the advice of your Ministers.

ব্রিটিশ রাজশক্তির উদ্দেশ্য ছিল সাম্প্রদায়িক বিভাজন ঘটানো।কিন্তু তাদের সেই হীন প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়।আগস্ট বিপ্লব ব্রিটিশ শাসনের ভিতকে আলগা করে দেয়।আর পাঁচ বছর পরই তাদের ভারত ছেড়ে চলে যেতে হয়।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published.