ট্রোল-এর শিকার রবীন্দ্রনাথ

অভিষেক ব্যানার্জীঃ

আজ ২৫ শে বৈশাখ – বাঙালির ঠাকুর পুজোর দিন । বছরের এই একটা দিন গড়পরতা বঙ্গবাসী বইয়ের তাকে ধুলো পরা রবীন্দ্র রচনাবলী , গীত বিতান , সঞ্চয়িতা নামিয়ে তার মতো করে কবি স্মরণ করে । কারণ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তো আমাদের চোখে নিছকই বিশ্বকবি নন আক্ষরিক অর্থেই প্রাসংগিক অপ্রাসংগিক সব আবেগের প্রতিভূ ;স্বভাবতঃই প্রথম সবকিছুর সাক্ষী!

তাই আজ একটু ফিরে দেখা কবির জীবদ্দশায় হওয়া তাঁর অবমূল্যায়ন এবং তাঁর আংগিকে আমাদের উত্তরাধিকার !

প্রথম এশীয় নোবেল লরিয়েট হিসেবে একদিকে যখন তিনি প্রথম আন্তর্জাতিক বাঙালি হিসেবে বিশ্বের দরবারে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করছেন ঠিক তখনই সমসাময়িক সহনাগরিকরা তাঁকে “দুশ্চরিত্র ” “অশ্লীল ” “হিন্দু বিরোধী ” “জাতীয়তাবাদ বিরোধী ” “ব্রিটিশ সমর্থক ” ইত্যাদি চোখা চোখা বিশেষণে শুধু ভূষিতই করছে না রীতিমত তাঁর বিরুদ্ধে সমান্তরাল জনমত তৈরি করার চেষ্টা করছে !

আজকের “ফেসবুক টুইটার” অভ্যস্ত প্রজন্মের পরিভাষায় যাকে troll করা বলে কবি বোধয় তার প্রথম বাঙালি সেলিব্রিটি ভিকটিম দের অন্যতম – হ্যাঁ , ঠিকই পড়েছেন -troll /ট্রোল – যার খুব কাছাকাছি বোধগম্য বাংলা সংগা হতে পারে কটাক্ষ মিশ্রিত অশ্লীল এবং অপ্রাসংগিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সমালোচনা ।

ঐতিহাসিক ভাবে এই সমালোচনার উপজীব্য কখনো কবিগুরুর চরিত্র , কখনো তাঁর ব্যক্তিগত জীবনচর্যা, কখনো তাঁর পাওয়া আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আবার কখনো তাঁর সৃষ্টি !

শুরু করা যাক ১৮৮৬ সাল থেকে– প্রকাশ পেলো “কড়ি ও কোমল ” ; কবিতাতে রূপকার্থে ব্যবহৃত নারীশরীরের বর্ণনা সমসাময়িক কালিপ্রসন্ন কাব্যবিশারদের রোষের শিকার হচ্ছে আর কবি অশ্লীলতার দায়ে য়ে শুধু অভিযুক্ত হচ্ছেন তাই নয় তাকে নিয়ে parody ও তৈরি হচ্ছে “মিঠে – কড়া ” নাম দিয়ে !

যে কাব্যগ্রন্থের ইংরেজি অনুবাদ দেশের তথা এশিয়ার প্রথম নোবেল প্রাইস এনে দিচ্ছে সেই “গীতাঞ্জলি” ও কিন্তু সমালোচনা থেকে মুক্তি পায় নি –যখন ১৯১০ সালে প্রথম প্রকাশিত হচ্ছে তখন সমসাময়িক সমালোচক উপেন্দ্র নাথ কর তাঁর “গীতাঞ্জলি সমালোচনা ” তে কবি এবং তাঁর কবিতাকে একযোগে অপরিণত এবং শিশুসুলভ তকমা দিচ্ছেন !

এর পর ১৯১৩ সালে কবি যখন নোবেল পুরষ্কার পাচ্ছেন তখন সারা দেশ স্বাভাবিক কারণেই রবি বন্দনা তে মগ্ন; কারণ পরাধীন ভারতবর্ষের স্বাধীনতার আস্বাদ ছিলো এই পুরষ্কার ।অথচ তখনও বেশ কিছু বাঙালি সাহিত্যিক এবং সমালোচক তাঁর এই পুরষ্কার প্রাপ্তির কারণ হিসেবে তাঁর জমিদারি বংশ মর্যাদা কে তুলে ধরে “বৃটিশ পদলেহন কারি ” তকমাতে ভূষিত করে পাল্টা প্রচার করে চলেছে । অথচ রবীন্দ্র বন্দনা তে মগ্ন আমাদের পূর্বপুরুষদের কেউ একবার প্রশ্ন তুললনা না -যে ভারতবর্ষের অগণিত জমিদারদের ভিতর শুধু ঠাকুরবাড়ির সন্তান কি করে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায় করতে পারে বা ১৯০৫ সালের “বঙ্গ ভংগ “রোধ করার অন্যতম কারিগর কি সত্যি বৃটিশ পদলেহনকারি হতে পারে ? আসলে ট্রোল সংস্কৃতি তো আমাদের মজ্জাগত এবং দেশ কালের সীমানা ব্যতিরেকে একইরকম শাশ্বত ; তাই সম্পূর্ণ বিনা কারণে মিথ্যা অভিযোগে যখন একজন কৃতি মানুষকে হেয় প্রতিপন্ন করা হচ্ছে তখন আমরা নিঃশব্দে সেটা উপভোগ করি – ঠিক আজকের মতোই !

এখন যেমন meme বানানো হয় আমাদের পূর্বপুরুষরা হয়তো চুটকি বা জেলেপাড়ার সং দিয়ে সেই প্রয়োজন মেটাতেন । পার্থক্য শুধু আংগিকে মানসিকতাতে নয় ।

নোবেল পুরষ্কারের এক বছরের মাথায় ১৯১৪ সাল নাগাদ নারী স্বাধীনতার উজ্জ্বলতম দলিল ” স্ত্রীর পত্র” যখন প্রকাশিত হচ্ছে তখন সমাজের জেঠামশাইরা হই হই করে উঠলেন এই বলে যে — ” হিন্দু নারী দের আদর্শকে অপমান করা হয়েছে ” আর রাতারাতি কবি পাচ্ছেন ” হিন্দু বিরোধী তকমা” । এ যাত্রা সমালোচনা অনেক বেশী সার্বজনীন কারণ ধর্ম বা ধর্মীয় আচার কে উপলক্ষ করে তো লোক খ্যাপানো সব সময়েই সহজ ।তবে সবথেকে মজার এই প্রতিবাদের সামনের সারিতে ছিলেন আমাদের ঘরের ঠাকুমা -দিদিমা রা! যাদের স্বাধীনতার জন্য কবির কলম ধরা ।

”হিন্দু বিরোধী” বিতর্ক স্তিমিত হতে না হতেই এবার কবি বিদ্ধ হলেন দেশ বিরোধী বা আজকের পরিভাষায় antinational উপাধিতে – সৌজন্যে ১৯১৩ থেকে ১৯১৫ পর্যন্ত ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হতে থাকা উপন্যাস “ঘরে বাইরে ” ! স্বদেশী আন্দোলনের নেতা সন্দীপ যখন লেখকের কলমে ভিলেন হিসেবে প্রতিভাত হয় আর নায়ক নিখিলেশ জমিদার হয়েও গ্রামের মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে কমদামি বিদেশী পণ্যের ব্যবহারকে সমর্থন করে তখন সেটা কোথাও প্রচলিত prototype কে আঘাত করে ! আর প্রচলিতকে প্রশ্ন করলে “অচলায়তন ” সুরক্ষিত থাকবে কি করে – অতএব শুরু হয়ে গেলো প্রতি আক্রমণ !

ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস – যার গান আজ একাধারে ভারতবর্ষ , বাংলাদেশ এর জাতীয় সংগীত- তিনি রাতারাতি হয়ে গেলেন দেশদ্রোহী ? এমন কি পরবর্তী কালে এটাও বলা হলো এই গল্পের সন্দীপ আদতে গান্ধীর আদলে তৈরি ; অথচ কেউ এই প্রশ্ন করলো না ১৯১৫ সালে ৪৫ বছর বয়সে দেশে ফেরা গান্ধীজির সম্বন্ধে ১৯১৩ সালে লেখা উপন্যাস কি ভাবে আধারিত হতে পারে ? “রামের জন্মের আগে রামায়ণ রচনা” কি সর্বত্র সম্ভব নাকি !ট্রোল সংস্কৃতি কবেই বা যুক্তির তোয়াক্কা করেছে ।

তবে এইসব ইতিহাস ঘাটতে ঘাটতে একটা ব্যাপার পরিষ্কার – ট্রোল করার উত্তরাধিকার টা কিন্তু আমাদের আজন্ম । আর অভিযোগ গুলোও আদি অকৃত্রিম – “হিন্দু বিরোধী ” , ” anti national ” , “ইংরেজদের দালাল ” ইত্যাদি ।শুধু কালের নিয়মে উদ্দিষ্ট বা target রা বদলেছে !

কিন্তু যে উত্তরাধিকার কালের নিয়মে কোথাও হারিয়ে গেছে তা সমসাময়িক নেতাদের বিরুদ্ধ স্বর শোনার মানসিকতা এবং সেই স্বরকে স্বীকৃতি দেয়ার সৎ সাহস – না হলে যে গান্ধীকে শিখন্ডি করে রবি ঠাকুরকে আক্রমণ করা – সেই গান্ধীই শান্তিনিকেতনে গিয়ে কবিকে “গুরুদেব ” আখ্যা দিয়ে তাঁর রাজনৈতিক সমর্থকদের বার্তা দিচ্ছেন আবার রবি ঠাকুর তাকে “মহাত্মা ” উপাধি দিয়ে তাঁর কাজের সম্মান দিচ্ছেন । না ,এর পরেও বিভিন্ন বিষয়ে এঁদের ভিন্ন মত হয়েছে সে নারী শিক্ষা হোক কি অসহযোগ আন্দোলন ; কিন্তু তাতে পারষ্পরিক সম্মান কোন দিন ক্ষুন্ন হয় নি ।

তাই আসুন না পরিশেষে আজ রবিপুজোর গণ হিস্টরিয়ার দিনে কবির “sense of justice ” কে ধার করে শপথ নিই প্রশ্রয় এবং প্ররোচনার troll যদি থাকে তাহলে প্রতিবাদ টাও যেন সোচ্চার হয়; তবেই হয়তো রবীন্দ্র জয়ন্তী উদযাপন পাবে তাঁর poetic justice –কারণ কবির ভাষায়

“দেশে দেশে নিন্দে রটে, পদে পদে বিপদ ঘটে–

পুঁথির কথা কই নে মোরা, উল্‌টো কথা কই॥

জন্ম মোদের ত্র্যহস্পর্শে, সকল-অনাসৃষ্টি।

ছুটি নিলেন বৃহস্পতি, রইল শনির দৃষ্টি।

অযাত্রাতে নৌকো ভাসা, রাখি নে, ভাই, ফলের আশা–

আমাদের আর নাই যে গতি ভেসেই চলা বই॥”।

ছবিঃ সংগৃহীত

( মতামত লেখকের ব্যক্তিগত)

#tagore&congressidea

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published.