জাতীয় মতাদর্শে বলীয়ান কংগ্রেসকেই সাম্প্রদায়িক আগুন নেভাতে নেতৃত্ব দিতে হবে– রাহুল গান্ধী

অমিতাভ সিংহের প্রতিবেদনঃ

আগামী দিনে ভারতের ফাসিস্ত শক্তি বিজেপি’র বিরুদ্ধে জয়লাভের জন্য বিরোধী জোটের প্রয়োজনীয়তার ওপরেই জোর দিলেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী। লন্ডনে ‘আইডিয়াজ ফর ইন্ডিয়া’ শীর্ষক কনফারেন্সে গিয়ে তিনি বিজেপি বিরোধী ভোটকে একজায়গায় নিয়ে আসার কথা বললেন তিনি।কেন এটা করার দরকার সে সম্পর্কে তিনি বিশদভাবে আলোচনাও করলেন।তাঁর বক্তব্য, একটা শক্তি যখন সমস্ত স্বয়ং শাসিত প্রতিষ্ঠানগুলিকে দখল করে সংবিধানকে শ্বাসরুদ্ধ করে ফেলে তখন বাকী রাজনৈতিক দলগুলির উচিৎ একজোট হয়ে তা রোধ করা নাহলে ভারতের ঐতিহ্যশালী গণতন্ত্র বিপন্ন হয়। যেসব প্রতিষ্ঠান সংবিধানকে রক্ষা করে সেগুলি নিজেরাই যখন দখল হয়ে, তখন সংবিধান রক্ষা করতে সেই পদ এবং সংগঠনগুলির যে ভূমিকা নেওয়ার প্রয়োজন তা তাঁরা নিতে পারে না। রাহুল গান্ধী যে বিচারবিভাগ, নির্বাচন কমিশন,সিবিআই, ইডি,আয়কর দপ্তর,ইউজিসি, বিভিন্ন সাংস্কৃতিক, শিক্ষা,ক্রীড়া,মানবাধিকার কমিশন ইত্যাদির মত প্রতিষ্ঠানগুলির দিকে ইঙ্গিত করেছন তা পরিষ্কার।

‘আইডিয়াজ পর ইন্ডিয়া’ এমন একটি সংস্থা যার কাজ হল ব্রিটেন, আমেরিকা,ভারত ও ইউরোপের বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলির নীতিনির্ধারণ, এনআরআই ও বিভিন্ন দলের নেতৃবৃন্দকে একসাথে নিয়ে আসার কাজে সহায়তা করা। অতীতে মন্ত্রী,সেনানায়ক, কূটনীতিক, বিদ্বদজন ও মিডিয়া প্রভৃতিদের নিয়ে গত তিন বছর ধরে করেছে।তারা মনে করে এইভাবেই বিভিন্ন বিষয়ে কথোপকথনের মধ্যে দিয়ে গণতান্ত্রিকভাবে একটা সর্বসম্মত মত উঠে আসবে।এই কনফারেন্সে রাহুল গান্ধী ছাড়াও সীতারাম ইয়েচুরি, সলমন খুর্শিদ সহ বিভিন্নদলের একাধিক নেতা নেত্রী ও বিভিন্ন শাখার বিশিষ্টরাও অংশগ্রহন করছেন।কিন্তু রাহুল গান্ধী যেভাবে বর্তমান ভারতের শ্বাসরুদ্ধ অবস্থাটাকে তুলে ধরেছেন তা কিন্তু বাকী সবাই তুলে ধরতে ইতস্তত করছেন।এখানেই রাহুল গান্ধীর মত ভয়ডরহীন নেতৃত্ব হিসাবে তাঁকে আলাদা করে চিনে নিতে সাহায্য করেছে।

রাহুল বলেছেন, ভারত এমন একটা দেশ হতে পারে না যেখানে মানুষকে কথা বলতে দেওয়া হবে না।প্রধানমন্ত্রী শুধু একাই কথা বলে যেতে চান,অন্য কারও কথা শুনতে চান না।কিন্তু তাঁকে দেশের জনতার কথাও শুনতে হবে।আমরা সকলে মিলে তাঁকে বাধ্য করতে পারি যদি আমরা এক হই। নিজেদের সংকীর্ণ মানসিকতা বিসর্জন দিতে হবে।তাতে আঞ্চলিক স্বার্থ সাময়িকভাবে বিঘ্ন হতে পারে।কারণ সব রাজ্য সরকারকেই কমবেশী কেন্দ্রীয় সরকারের মুখাপেক্ষী হতে হয়।তিনি বলেন আমরা মনে করি বিভিন্নজনের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে কোন মত গড়ে ওঠে। কিন্তু বিজেপি ও আরএসএস বিশ্বাস করে ভারত শুধুমাত্র একটা ভৌগোলিক দেশ।তারা তাই ভাবে বিভিন্ন সুবিধাগুলি মুষ্টিমেয়দের জন্যই বরাদ্দ করলেই চলবে।কাছের মিত্র- শিল্পপতিদের সঙ্গে জড়িত লোকজন বা তাদের মতাদর্শে বিশ্বাসী লোকজনকেই সুবিধাগুলি পৌঁছে দাও,এটাই তাদের মনোভাব। রাহুল বলেন,তিনি বিশ্বাস করেন প্রত্যেকের সমানাধিকার আছে তা সে ব্রাহ্মণ হোন অথবা দলিতই হোন। এখানেই আসল লড়াই।

তিনি বলেন আমাদের গণতন্ত্র এই গ্রহের একটা ভরসার জায়গা।তাই এটা ভেঙে পড়লে তার প্রতিফলন অন্য জায়গায়ও পড়বে।আজ আমেরিকাও নিশ্চই তা বুঝতে পারছে। যেসব স্বয়ংশাসিত ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠান কথোপকথন চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার পক্ষপাতী,তাদের ওপর পরিকল্পিতভাবে নিয়মিত আক্রমন করা হচ্ছে,আঘাত হানা হচ্ছে।তারা না বাঁচলে দেশের সংবিধানও বাঁচবে না।

কংগ্রেসের মতাদর্শ স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন আমার কথার ভুল ব্যাখ্যা হয়েছে। গোদী মিডিয়া বিরোধীদের মধ্যে ফাটল ধরাতে এই চক্রান্ত করেছে। জাতীয় মতাদর্শ যা কংগ্রেসের আছে তা কি করে একটা আঞ্চলিক দলের থাকবে? তাদের তো তাদের রাজ্যের সমস্যা নিয়ে চলতে হয়।তাই তাদের জাতীয় মতাদর্শের চেয়ে গুরুত্ব দিতে হয় আঞ্চলিক ভাবনাকে।এখানে লড়াই হচ্ছে কংগ্রেসের মতাদর্শের সঙ্গে আরএসএস ও বিজেপির মতাদর্শের।একটা গণতান্ত্রিক ও উন্নয়নশীল মতাদর্শের সাথে সর্বগ্রাসী ফাসিস্ত মতাদর্শের।

লড়াইটা হলো সমবন্টনের মতাদর্শের সঙ্গে একচেটিয়া কারবার বা বেসরকারি সংস্থার মনোপলির মতাদর্শের।একটা সংস্থা সব বিমানবন্দর, সব সমুদ্রবন্দর,পরিকাঠামো নিয়ন্ত্রন করবে,এটা খুবই বিপজ্জনক প্রবণতা। একইরকমভাবে তারা প্রায় সমস্ত সংবাদমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রন করে ফেলেছে। এর ফলে মূলধন কেন্দ্রীভূত হয়ে যাচ্ছে।ছোট ও মাঝারি শিল্প গড়তে সাধারন ঘরের যুবকেরা সাহস পাচ্ছেন না । তাই এ লড়াই নিছক একটা রাজনৈতিক লড়াই নয়,আমাদের কাছে এ লড়াই একটা নির্দিষ্ট দীর্ঘমেয়াদী ও প্রতিটি মানুষের সম অধিকারের যে মতাদর্শ, তার লড়াই। ফলে যে ৬০ শতাংশ মানুষ বিজেপিকে ভোট দেয় নি তাদের প্রত্যেকের কাছে কংগ্রেসনসহ বাকী বিরোধীদেরও যেতে হবে সঙ্ঘবদ্ধভাবে।

রাহুল গান্ধী সাবধান করে দিয়েছেন যে সারা দেশে বিজেপি ঘৃণার কেরোসিন ছড়াচ্ছে। একটা আগুনের ফুলকি লাগলেই সারা দেশে সমস্যা তৈরী হয়ে যাবে।তাই প্রধানত কংগ্রেসকেই এই আগুন নেভাতে নেতৃত্ব দিতে হবে,দায়িত্বশীল হয়ে বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষকে এককাট্টা করতে হবে।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published.