রাজীব গান্ধীর স্বপ্ন ছিল জনগণের সরকার

দীপ্তিমান ঘোষ

দীর্ঘ ২০০ বছর ভারতবর্ষ পরাধীন ছিল। ব্রিটেনের দ্বারা শাসিত ভারতে স্বাধীনতা ছিল না বললেই চলে। ব্রিটিশ রাজের কথায় লন্ডন, কলকাতা বা দিল্লী এরকম রাজধানী শহর থেকেই আসমুদ্র হিমাচল ভারতবর্ষ শাসিত হত। লক্ষ কোটি ভারতবাসী, বিশেষত গ্রামীণ জনগণ, তাঁদের কোনোই স্বাধীনতা ছিল না ব্রিটিশ যুগে। ১৯৪৭-এ দেশ স্বাধীন হল। স্বাধীনতার মূল কাণ্ডারি মহাত্মা গান্ধীর ভাবনায় গ্রামভারতই হল ভারতের প্রাণ, ভারতের আত্মা। তাই গান্ধীজী বলেছিলেন গ্রাম স্বরাজের কথা। তাঁর কাছে ভারতের স্বরাজের মৌলিক আকর ছিল গ্রাম স্বরাজ।

১৯৪৭-এ দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে প্রথম তিনটে দশকে গ্রামের স্বাধীন স্বতন্ত্র শাসনের বিষয়, রাজনীতির মূলস্রোতের ভাবনা ছিল নিতান্ত কম। কিন্তু ১৯৮০-র দশকের শেষার্ধে গ্রামীণ স্বায়ত্ব শাসনের ভাবনা যা আজ প্রতিদিনকার কথায় পঞ্চায়েতি রাজ নামে পরিচিত; রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠা পায়। আর গ্রামের মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রনের রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার পেছনে যিনি কাণ্ডারি, তিনি হলেন রাজীব গান্ধী। ১৯৮৫ থেকে ১৯৮৯ মাত্র পাঁচ বছর ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন রাজীব। কিন্তু এই কম সময়ের মধ্যেই এক দিকে প্রযুক্তিক্ষেত্রে কম্পিউটার এনে বিপ্লবের সূচনা করেছিলেন, অন্যদিকে রাজনৈতিক ও সামাজিক গণতন্ত্রের পরিসরে পঞ্চায়েতি রাজ নামক বৈপ্লবিক পদক্ষেপও রাজীবের ভাবনার ফসল। তাঁর শাসনকালেই গ্রাম পঞ্চায়েতের মধ্য দিয়ে গ্রামীণ মানুষের রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার এক নতুন যুগের সূচনা হয়েছিল। কাজেই আজকে যারা দুয়ারে সরকারের কথা বলছেন তাঁদের স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে সত্যি করে মানুষের কাছে শুধু সরকার নয়, মানুষের সরকার — যা কি না পঞ্চায়েত ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে দেশের প্রত্যন্ত গ্রামে এবং প্রত্যেকটি গ্রামে গড়ে উঠতে পেরেছে তার পিছনে কিন্তু একটি মানুষের রাজনৈতিক দিশা ও সুদূরপ্রসারী ভাবনার অবদান। সেই মানুষটি হলেন রাজীব গান্ধী। প্রযুক্তি ও পঞ্চায়েত দুয়েতেই তিনি দেশকে পথ দেখিয়েছিলেন।  

সারা দেশে পঞ্চায়েতের নির্বাচন প্রধানত সুষ্ঠভাবে হয়। অথচ আমাদের এই পশ্চিমবঙ্গ, আমরা আগের আমলে দেখেছি পঞ্চায়েত নির্বাচনকে ঘিরে রক্তক্ষয়ী মারামারি এবং বহু মানুষের নিহত হওয়ার ঘটনা। আবার এই আমলে দেখছি যে ২০১৮ সালে পঞ্চায়েত ভোটটা ক্ষমতাসীন দল পুরোপুরি লুঠ করলেন। ভোটই হল না। তার ফলস্রুতিতে আমরা দেখলাম ২০১৯-এ  রাজ্যের শাসকদলের ওপর মানুষের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনে রাতারাতি বিজেপির হাতে চলে গেল, ৪২-এর মধ্যে ১৮টি আসন। তাহলে কি বললে ভুল হবে যে ২০১৯ সালের বিজেপির উত্থানের পিছনে ২০১৮ সালের তৃণমূল দ্বারা পঞ্চায়েত ভোট লুঠই আসল কারণ! রাজীব গান্ধী যে সুদূরপ্রসারী ভাবনার পরিচয় রেখেছিলেন পঞ্চায়েতি রাজের  পরিকল্পনায়, সংবিধানের ৭৩তম সংশোধনীর মধ্য দিয়ে ২৪শে এপ্রিল ১৯৯৩ যে পঞ্চায়েতি রাজ ব্যবস্থা সারা দেশে কায়েম হয়, তাকেই ধূলিসাৎ করে দিয়েছে অন্তত পশ্চিমবঙ্গের মাটিতে ২০১৮তে তৃণমূল দলটির লেঠেল রাজনীতি। পঞ্চায়েত  ভোটকে লুঠ করে, তারপরে বলা দুয়ারে সরকার; একথা কি তাঁদের মুখে মানায়! যদি পশ্চিমবঙ্গের মানুষকে, ভারতবর্ষের মানুষকে গণতন্ত্রের পথে রাজনৈতিক আত্মনিয়ন্ত্রণের পথে ভারতের সংবিধানের প্রতি শ্রদ্ধার পথে, আইনের শাসনের পথে ও মহাত্মা গান্ধীর গ্রাম স্বরাজের পথে এগিয়ে চলতে হয়, তাহলে মানুষের সামনে একটাই বিকল্প। মানুষকে হাত বাড়াতে হবে জাতীয় কংগ্রেসের দিকে, আর আমরা জাতীয় কংগ্রেস মহাত্মা গান্ধীর পথে, নেহরু-ইন্দিরা-রাজীবের পথে মানুষের দিকে বাড়িয়ে দিয়েছি আমাদের হাত।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published.