নারী নির্যাতন

একটি কাল্পনিক আলাপচারিতা এবং…

মীরাতুন নাহার

— হ্যালো ম্যাডাম !

— হ্যালো, বলুন। আমি অরুণা হালদার বলছি।

— ম্যাডাম বলছিলাম,আপনার একটা প্রতিক্রিয়া চাই। আমি সংবাদ বাজার সংবাদপত্র থেকে বলছি। আজকের ঘটনা। আদালতে একটি নাবালিকা অভিযুক্তকে চেনে না বলেছে। অথচ বত্রিশ বছরের ছেলে টির বিরুদ্ধে তার বাড়ি থেকে নালিশ জানানো হয়। মামলা হয়। পুলিশ তাকে আদালতে তোলার দিন নির্যাতিতা নাবালিকার সামনে দাঁড় করানোর পর সে ছেলেটিকে কখনো দেখে নি জানিয়েছে। অভিযুক্ত তাই ছাড়া পেয়ে গেছে। এমন ঘটনা এখন প্রায়ই ঘটছে দেখা যাচ্ছে। আইন কঠোরতম করা হয়েছে নাবালিকা ধর্ষণের জন্য শাস্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে। তবু সে আইন কাজে লাগছে না। কেন এমন হচ্ছে ? আপনার মতটি যদি জানান!

— আপনার কি মনে হয় শাস্তি কঠোর হলেই দেশ থেকে অপরাধ দূর হয়ে যাবে? অপরাধ আর শাস্তির সম্পর্ক কি তেমন বলে, আপনি বিশ্বাস করেন? আমার কিন্তু তা মনে হয় না! আইনবলে অপরাধী সাব্যস্ত হলে অভিযুক্ত রা যদি কঠিন সাজা পায় তাহলে আর কেউ তেমন অন্যায় ঘটাবে না — এমনটি হলে তো ভালোই হত! কিন্তু দুঃখের বিষয় হল, তেমনটি তো বাস্তবে ঘটে না!

— না ম্যাডাম, আমি ঠিক তেমনটি ভাবি না। আমি বলেছিলাম, নাবালিকা ধর্ষণের বিচারব্যবস্থা প্রয়োগ করার ক্ষেত্রে নির্যাতিতা নিজেই যদি অসহযোগিতা করে তাহলে এই প্রকার হীন অপরাধ বন্ধ করা যাবে কিভাবে ? এবং আপনার কাছে আমার প্রশ্ন একটি এবং নির্দিষ্ট। সেটি হল — বিচারের শেষ পর্যায়ে গিয়ে অপরাধীকে চিনিয়ে দিতে ভিক্টিম নিজেই পিছিয়ে যাচ্ছে কেন ? এর পিছনের কারণ কি বলে আপনার মনে হয় ?

— কারণ একটি নয়। ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্রে ভিন্ন কারণ থাকতে পারে। নির্দিষ্ট করে বলা তাই সম্ভব নয়।

— কি রকম ? একটু বলুন।

— হতে পারে পাড়ার ‘দাদা-রা’ মেয়েটিকে ভয় দেখিয়েছে। ‘মুখ খুললে বিপদ’ শুনিয়েছে। অথবা পুলিশই হিতাকাঙ্খীর ছদ্মবেশে তার ভালোর জন্যই তাকে না-চেনার ভান করতে বলেছে অন্যপক্ষের কাছ থেকে ‘নগদ’ আদায় করে নিয়ে। আত্মীয় স্বজনেরা ভবিষ্যতে আবার মেয়েটি আক্রান্ত হতে পারে ভেবে তাকে কালপ্রিট-কে চিনতে না পারার অভিনয় করতে নির্দেশ দিয়েছে–এমনটিও হতে পারে। এমনও হতে পারে যে, মেয়েটি নিজেই আক্রান্ত হওয়ার নিষ্ঠুর অভিজ্ঞতার কথা মনে করে ভয় পেয়েছে ছেলেটির দিকে তাকিয়ে এবং ভয়ে ‘চিনি না’ বলে ফেলেছে।

এমন সব সম্ভাব্য কারণের কথা বলতে বলতে অরুণার মনে পড়ল একটা টি.ভি. চ্যানেলের আলোচনা শেষে বেরিয়ে এই তো সেদিন ‘ মহিলা অধিকার রক্ষা কেন্দ্রে’র অধিকর্তাকে বলতে শুনেছিল — ” অরুণা দি, জানেন তো এইসব মেয়েরা টাকা-পয়সা নিয়ে অভিযোগ তুলে নেয়? আবার টাকা-পয়সা আদায়ের জন্য মিথ্যা অভিযোগও করে! আপনি আলোচনার মধ্যে আমাকে প্রশ্ন করেছিলেন – “আপনারা কি করেন? এই অত্যাচারিত মেয়েদের পাশে দাঁড়ানোই তো আপনাদের মূল কাজ?” তখন সত্য কথাটা বলতে পারিনি ! এখন বলছি তাই। আমরা সাহায্য করতে গিয়ে বিপদে পড়ে যাই। সাংবাদিক ভদ্রলোকও সম্ভবত তেমন উত্তরই তার কাছ থেকে প্রত্যাশা করে প্রতীক্ষা করছেন প্রতিক্রিয়া পাওয়ার। কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন তিনি। তারপরে ভাবলেন, সংবাদ-মাধ্যম গুলিই তো যত নষ্টের বাড়া! এদের একটু ঘা দেওয়া দরকার1।

— আচ্ছা, আপনাদের ভূমিকার কথা কখনো ভেবেছেন ? মেয়েদের অর্ধ-নগ্ন শরীর দেখিয়ে পুরুষ ও মেয়েদের সুস্থ-স্বাভাবিক সম্পর্ক নষ্ট করে চলেছেন আর অর্থ-রোজগারের ঘোরে থেকে ভুলে গেছেন আপনাদের সামাজিক দায়বদ্ধতার কথা! পুরুষদের মধ্যে লালসা নির্মাণের অন্যতম কারিগরের ভূমিকা নিয়েছেন আপনারা আর সেই লালসার শিকার হচ্ছে সাধারণ ঘরের নিরীহ মেয়েরা! তারপর আপনারা ধর্ষণের খবর ছাপিয়ে আকর্ষণীয় করে তুলছেন খবরের পাতা! এরপর টাকা-পয়সা নিয়ে মেয়েদের উপর অভিযুক্তকে না চেনার দায় চাপাতে আমাদের মতো মানুষদের প্ররোচিত করছেন – তাই না? শুনে নিন, আপনারা মানুষদের মধ্যেবিকৃত কামনা জাগানোর প্রক্রিয়া বন্ধ না করলে নাবালিকা নির্যাতন বন্ধ করার জন্য যত কড়া শাস্তির বিধান তৈরি হোক না কেন তা কাজ করবে না।

— কি বলছেন ম্যাডাম ? আমরা… আমরা…সংবাদ জগতের…

— ঠিকই বলছি আমি। আমার এই প্রতিক্রিয়াই প্রকাশ করবেন দয়া করে। রোজ সকালে খবরের কাগজ খুললেই উত্তেজনা জাগানো নারী শরীর নির্ভর বিজ্ঞাপনে সজ্জিত পাতাগুলি দেখলে বিকৃত কামনার বলি হওয়া মেয়েদের জন্য আপনাদের মিথ্যে উদ্বেগ প্রকাশ কে ধিক্কার দিতে দিতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি, জানবেন। এইপ্রকার দ্বিচারিতা কত আর সওয়া যায়! তবু সইতে হচ্ছে। কি করে গরীব ঘরের ধর্ষিতা মেয়েদের দোষ কেবল দেখি বলুন তো? তারাই কেবল টাকা-পয়সা-ভয়-লোভ — এসবের শিকার হয়?

— না-না-না ম্যাডাম। আপনি রাগ করবেন না….

অরুণা ফোন কেটে দিয়ে ভাবলেন, কাল তাঁর প্রতিক্রিয়াটি আর প্রকাশ পাবে না। বাঁচা যাবে ! আর কোনোদিন এই ধরণের প্রতিক্রিয়া নেওয়ার কর্তব্যপালন-রত সাংবাদিকের মনোমত উত্তর তাঁকে দিতে হবে না!

পরের দিন সকালে পেপারে চোখ রেখে হতবাক হলেন অরুণা। তাঁর ছবিসহ তাঁর মত প্রকাশিত হয়েছে আরো কয়েকজনের অভিমতের পাশাপাশি গুরুত্ব সহকারে দু-তিন টি বাক্যে। প্রখ্যাত লেখিকা অরুণা হালদারের মতে, “অভিযুক্তেরা বহু ক্ষেত্রে ধর্ষিতা নাবালিকাদের তুলনায় প্রভাবশালী হয়। সেকারণে নির্যাতিতার পরিবার-পক্ষ নানাপ্রকার প্ররোচনার ফাঁদে পড়ে অপরাধীকে চিনতে না পারার কথা বলে এবং তাতে আইনের ফাঁক গলে অপরাধীরা শাস্তি পাওয়া থেকে রেহাই পেয়ে যায়। এভাবে আইনে কড়া সাজার ব্যবস্থা থাকলেও তা কার্যকর হতে পারে না।”

অরুণা গরম চায়ে মুখ দিয়ে কাপ নামিয়ে রাখলেন মুখ থেকে। সূর্যের আলো ছড়িয়ে পড়েছে সকালের বার্তা নিয়ে ঘর-ময়। সে আলো অরুণার মুখেও পড়ছে। তবু সে মুখে থমথমে অন্ধকার!

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published.