মোদী সরকারের গড়িমসিঃ ইউক্রেনে ভারতীয় ছাত্র-ছাত্রীদের সমস্যা

পার্থ মুখোপাধ্যায়

রাশিয়া ইউক্রেন নিয়ে তার অবস্থানে অনড় ছিলো যে কোনো অবস্থায় তারা ইউক্রেনের ন্যাটোর সদস্যপদ নেওয়া মেনে নেবেনা। ইউক্রেনও তার অবস্থানে অনড় ছিলো ন্যাটোর সদস্যপদ নেওয়ার ব্যাপারে। ফেব্রুয়ারির শুরুতেই রাশিয়া পরিস্কার ভাবে জানিয়েছিলো যে তারা তাদের দেশের অনতিদূরে ন্যাটোর উপস্থিতি মেনে নেবেনা এবং প্রয়োজনে তারা যুদ্ধের পথেও যেতে প্রস্তুত। রাশিয়ার এই কঠোর অবস্থান যে শুধুমাত্র ফাঁকা আওয়াজ নয়, তাও তারা বুঝিয়ে দিচ্ছিল সেনা ও যুদ্ধাস্ত্রের ক্রমান্বয়িক সমাগমে। এই ঘটনাক্রম ভারতের দৃষ্টিতে খুবই উদ্বেগজনক শুধুই দীর্ঘকালীন বন্ধু রাষ্ট্র রাশিয়ার জন্যই নয়, তার চেয়েও ভারতবাসীদের পক্ষে আরও বিপজ্জনক বিষয় ছিলো প্রায় কুড়ি হাজার ভারতীয় ছাত্রছাত্রীদের সেই সময়ে ইউক্রেনের বিভিন্ন শহরে অবস্থান। এইসব ভারতীয় ছাত্রছাত্রীরা প্রধানত ইউক্রেনে গিয়েছিলেন মেডিক্যাল কোর্স করার কারনেই।

এহেন জরুরি পরিস্থিতিতে ভারতীয় ছাত্রছাত্রীরা ভারত সরকারের ওপর নির্ভরশীল হয়েছিলেন দেশে ফিরে আসা নিয়ে সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে, কিন্তু এইসব ছাত্রছাত্রীরা তখন পড়লো এক অনিশ্চিত দোটানায়। ভারতীয় দূতাবাসের মাধ্যমে মোদী সরকার সময়ে সময়ে এ্যাডভাইসারি পাঠাচ্ছিল একটা সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য। এদিকে ছাত্রছাত্রীরা তখন একটা জটিল সমস্যার সম্মুখীন, কেননা তার যে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গুলিতে পাঠরত, তারা জানিয়েছিলো তাদের প্রতিষ্ঠানগুলিতে ক্লাসে শারিরীকভাবে উপস্থিত থাকতে হবে এবং কোনো প্রকারের অনলাইন ক্লাস হবেনা। তারা এও জানিয়ে দেয় যে যারা ক্লাস করবে না, তারা শিক্ষাবর্ষগত ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হবে। এর ফলে সমূহ বিপদজ্জনক পরিস্থিতির সামনেও সেই সব ছাত্রছাত্রীরা সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলো না। তাদের সিদ্ধান্তহীনতাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছিলো মোদী সরকারের এ্যাডভাইসরি যে সিদ্ধান্ত ছাত্রছাত্রীদেরই নিতে হবে দেশে ফেরা বা না ফেরার ব্যাপারে। এমন কি ভারতীয় ছাত্রছাত্রীদের জীবনের ঝুঁকি বাড়লেও ভারত সরকার ইউক্রেন থেকে কাউকে সরাসরি ফেরানোর কোনো উদ্যোগই নেয়নি। ফলত যুদ্ধ পরিস্থিতি যতো ভয়াবহ ও বিপজ্জনক রুপ নিলো, পশ্চিমী দেশগুলি ও আমেরিকা সমেত অগ্রগন্য দেশ সমূহ কিন্তু তাদের দেশের নাগরিকদের ইউক্রেন থেকে সরিয়ে নিয়ে যেতে পেরেছিলো। যুদ্ধ পরিস্থিতি যতো সঙ্গীন হলো, ইউক্রেনে আটকে পড়া ভারতীয় ছাত্রছাত্রীদের সমস্যা, এমনকি জীবনের ঝুঁকিও বাড়ছিলো। অবধারিত যুদ্ধের প্রারম্ভেও সরকার কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

স্বাভাবিক ভাবেই যুদ্ধপরিস্থিতির যতো বিস্তার হলো, ছাত্রছাত্রীদের জীবনের ঝুঁকিও ততো বাড়তে লাগলো। স্বাভাবিক কারনেই ইউক্রেনের আকাশ নো ফ্লাই জোন হিসেবে ঘোষিত হলো। ইতিমধ্যে দুজন ছাত্র যুদ্ধের বলিও হলো। নো ফ্লাই জোন হওয়ায় সরাসরি ইউক্রেন থেকে উদ্ধারের আশাও রইলো না।

ভারত সরকারের এই অপার অপারগতার কারনে ছাত্রছাত্রীরা শেষ পর্যন্ত ইউক্রেন ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিলো যে যার মতো করে দলবদ্ধভাবে। পোলান্ড ও রুমানিয়ার সীমানার দিকে তারা যাবার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হলো তাদের অবস্থানগত দূরত্বের কথা মাথায় রেখে। যারা আপাত ভাগ্যবান, তারা ট্রেন এবং গাড়িতে করে ইউক্রেনের সীমানা পেরোনোর পরিকল্পনা করলো। এইসব আপাত ভাগ্যবানরা ছাড়াও এক বিশাল সংখ্যক ছাত্রছাত্রী পায়ে হেঁটে সীমান্ত পার হওয়ার চেষ্টা করলো। নানা বাধা, বিঘ্ন ও বিপত্তি অতিক্রম করে এই সব ছাত্রছাত্রীরা ইউক্রেনের সীমানা পেরিয়ে পোলান্ড ও রুমানিয়ায় প্রবেশ করলো। এই সমগ্র সময়ে যে গুরুতর অভিযোগটা উঠেছে তা হলো ইউক্রেনের ভারতীয় দুতাবাস থেকে এইসব ছাত্রছাত্রীরা কোনো সহযোগিতা তো পাননি, উল্টে সহযোগিতার চাওয়ার সময় অপমানজনক উপেক্ষাই পেয়েছেন।

ইতিমধ্যেই মোদী সরকার তাদের স্বভাবসিদ্ধ চরিত্রের পরিচয় দিতে শুরু করেছে। সীমানা পেরোনো ছাত্রছাত্রীদের জন্য চারজন মন্ত্রীর তত্বাবধানে বিমান পাঠানোর কাজ শুরু করলো। সেই সঙ্গে শুর করলো প্রচারের ঢক্কানিনাদ। বিমানের মধ্যেই শুরু হলো রাজনৈতিক ব্যক্তব্য রাখার কাজ যার অর্থ হলো মোদী সরকার থাকার জন্য এবং সরকারের চেষ্টার জন্যই নাকি তাদের উদ্ধার করে দেশে ফেরত নিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে। চললো ছাত্রছাত্রীদের গোলাপ ফুল দিয়ে বিমানবন্দরে সম্বর্ধনা কিন্তু বেশিরভাগ ছাত্রছাত্রীই সরকারি প্রতিনিধিদের হাত থেকে সেই ফুল নিতে অস্বীকার করে। এমনকি মন্ত্রীদের স্বাগত সম্ভাষণের অনেকেই কোনো প্রত্যুত্তরই দেয়নি তাদের উপস্থিতিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা এবং অবজ্ঞা করে।

এই সব ইউক্রেন ফেরত ছাত্রছাত্রীদের ব্যক্তব্য হলো যে প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে, নিজেদের চেষ্টায় তারা যুদ্ধক্ষেত্র ইউক্রেন থেকে বেরিয়ে হাজার প্রতিবন্ধকতা সহ্য করে অন্য দেশে চলে আসার পরে তাদের বিমানে চাপিয়ে নিয়ে আসাকে আর যাই হোক, উদ্ধার অভিযান বলেনা। তাঁদের আরও অভিযোগ যেখানে যুদ্ধ চলছে, সেখানে মোদী সরকার বা ভারতীয় দূতাবাসের কোনও সাহায্য তাঁরা পাননি। তাঁদের আরও ব্যক্তব্য অন্য যে কোনও দেশ থেকে তো এমনিই বিমানের টিকিট কেটে চলে আসা যায়। তার জন্য মোদী সরকারের কী দরকার? এই পরিপ্রেক্ষিতেই
তাঁদের প্রশ্ন যে সব দেশে যুদ্ধ হচ্ছে না, সেখান থেকে বিমানে চাপিয়ে নিয়ে এসে সেটা কেন বড় করে দেখানো হচ্ছে এবং তা রাজনৈতিক প্রচারের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে। এইসব ছাত্রছাত্রীরা আরও অভিযোগ করেছে যে কেন যুদ্ধরত রাশিয়া এবং ইউক্রেনের সরকারের সঙ্গে কুটনৈতিক স্তরে আলোচনা সাপেক্ষে সুমি, কিয়েভ, খারকিভের মতো যুদ্ধবিধ্বস্ত শহরগুলি থেকে সরাসরি বিমানে উদ্ধার করে আনা হয়নি। উপরোক্তো প্রশ্নগুলি যে কতো গভীর ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে, তার প্রমান পাওয়া যায় ভারতীয় ছাত্রছাত্রীরা দিল্লিতে নেমেই ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন ভারত সরকারের প্রতি। এক সুরে তাঁদের বক্তব্য, যুদ্ধক্ষেত্র পরিস্থিতির মধ্যে থেকে নাগরিকদের উদ্ধার করে আনাকেই একমাত্র উদ্ধার অভিযান আাখ্যা দেওয়া যায়। আসল ঘটনা ইউক্রেনে, যেখানে যুদ্ধ হচ্ছে, সেখানে ভারত সরকারের তরফে কোনও প্রকার সাহায্য পাওয়া যায়নি। পড়ুয়াদের নিজের ভাগ্যের হাতেই ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। ভারত সরকারের কাজ ছিল, ইউক্রেনের যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকাগুলে থেকে পথ দেখিয়ে ভারতীয়দের সেই দেশ থেকে বার করে আনা। যে ভাবে যুদ্ধ না হওয়া দেশগুলি থেকে পড়ুয়াদের বিমানে নিয়ে এসে মোদী সরকার নিজেদের ঢাক পেটাচ্ছে, তা নির্ভেজাল রাজনীতি। এই সব ছাত্রছাত্রীদের অভিজ্ঞতা প্রসূত ব্যক্তব্য ‘অপারেশন গঙ্গা’ নিয়ে মোদী সরকারের প্রচারের বেলুন ফুটো করে দিয়েছেন।

সামগ্রিকভাবে ছাত্রছাত্রীদের উপরোক্ত অভিজ্ঞতা এবং গুরুতর অভিযোগগুলির সত্যতা প্রমানিত হয়েছে এই সময়ে সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওর মাধ্যমে। এই ভিডিওটি রুমানিয়ার একটি শিবিরের, যেখানে দেখা যাচ্ছে স্থানীয় একটি শহরের মেয়র মোদী সরকারের এক মন্ত্রীকে রীতিমতো চ্যালেঞ্জ করছেন এবং অভিযোগ করছেন তার প্রশাসন সেই শিবিরে থাকা ছাত্রছাত্রীদের থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থা করেছেন অথচ ভারত সরকার তাঁদের দেশে ফিরিয়ে আনার কোনো উদ্যোগই নিচ্ছেনা।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published.