শ্যামাপ্রসাদ: ইতিহাসের অনুবৃত্তি*

—-অশোক ভট্টাচার্য(রাজা)

১৯৩৬-৩৭ সালে শীতকালে অনুষ্ঠিত হলো ব্রিটিশ ভারতের প্রাদেশিক সভার নির্বাচন।

বঙ্গীয় প্রাদেশিক সভার নির্বাচনের ফল হলো এমন–কংগ্রেস-৫৪; মুসলিম লিগ -৩৭; কৃষক প্রজা পার্টি -৩৬; ইন্ডিপেনডেন্ট মুসলিম পার্টি -১০ এবং অন্যান্য রা -১১৩( এই অন্যান্যদের মধ্যে ছিলো হিন্দু মহাসভাও)।

কৃষক প্রজা পার্টির কর্ণধার ফজলুল হক হলেন বাংলার প্রধানমন্ত্রী। ১৯৩৭ এই ফজজুল হক নিজের কৃষক প্রজা পার্টিকে মিশিয়ে দিলেন মুসলিম লিগের সাথে। গঠিত হলো ফজলুল হক এর মন্ত্রীসভা।

ইতোমধ্যে ১৯৩৮ সালে কংগ্রেস অধিবেশনে স্পষ্টত বলা হলো–” মুসলিম লিগ এবং হিন্দু মহাসভা -এ দুটিই সাম্প্রদায়িক সংগঠন। কংগ্রেস এ দু’য়ের সাথেই সমদূরত্ব বজায় রাখবে। ” তাই সে সময় এদের সাথে মন্ত্রী সভা গঠনে স্বাভাবিকভাবেই কংগ্রেস গররাজি ছিলো সমস্ত প্রদেশেই।

যারা কংগ্রেস কে বলেন,ক্ষমতা-লোভী,তাঁদের এ ইতিহাস জানার প্রয়োজন আছে আজ।

এহো বাহ্য। মজার ব্যাপার ঘটলো উত্তর প্রদেশে,(যুক্ত প্রদেশ) যেখানে কংগ্রেস ছিলো সংখ্যাগরিষ্ঠ সেখানে কংগ্রেস সরকার থেকে সরে আসার পর মুসলিম লিগ ও হিন্দু মহাসভা হাতে হাত ধরে সরকার গঠন করলো। একই ঘটনা ঘটলো সিন্ধ প্রদেশে।

এরমধ্যে এসে গ্যালো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। ১৯৪২ সালের ৮ ই অগাষ্ট। ঐতিহাসিক ‘ভারত ছাড়ো আন্দোলন’ ঘোষণা করলো কংগ্রেস। ৯ অগাষ্ট,ভোরের আলো ফোটার আগেই গ্রেপ্তার হলেন একে একে মহাত্মা গান্ধী,জহরলাল,মৌলানা আজাদ প্রমুখ নেতারা। সারা দেশ দেখলো নেতারা জেলে আর সাধারণ মানুষ দলে দলে পথে নেমে আন্দোলনকে সংগঠিত করছেন স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে।

পাশাপাশি ইতিহাসের পাতায় লেখা হয়ে গ্যালো আরো এক কলঙ্কময় অধ্যায়; মুসলিম লিগ এবং হিন্দু মহাসভা একযোগে সরে দাঁড়ালো ‘ভারত ছাড়ো ‘ আন্দোলন থেকে।

★ভারত ছাড়ো আন্দোলনে শ্যামাপ্রসাদের ভূমিকা★

————————————-

এই সময় হিন্দু মহাসভার নেতা শ্যামা প্রসাদ মুখার্জির ভূমিকা ছিলো সব থেকে ন্যক্কারজনক।

১৯৪২-এর ২৬ জুলাই বেঙ্গল গভর্নর জন হার্বার্টকে একটি চিঠি লিখে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী কংগ্রেসের বিরুদ্ধে মোকাবিলা করার একটি প্ল্যান ছকে দেন। শ্যামাপ্রসাদ লিখলেন

—-“যুদ্ধের এই সময়ে কেউ যদি জনতার আবেগ উস্কাতে চায় আর দেশের ভেতরে অস্থিরতা ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয় তাহলে সরকার চালোনোর স্বার্থে তা দমন করা সরকারের কর্তব্য”, প্রতিশ্রুতি দিয়ে লিখছেন শ্যামাপ্রসাদ, “আপনার একজন মন্ত্রী হিসেবে আমি আপনাকে সর্বান্তকরণ সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত আছি এবং এই সংকটের সময়ে আমি আমার প্রদেশ ও দেশের জন্য কাজ করতে চাই।”[সূত্রঃ Leaves From a Diary by Mookerjee Shyama Prasad( Author)]

ভালোভাবে পড়ুন শ্যামাপ্রসাদের চিঠির উল্লিখিত অংশটি। পড়লে বুঝতে পারবেন সীমান্ত যুদ্ধকে ঢাল করে শাসককে আড়াল করার যে কৌশল আজকের বিজেপি- আর এস এস নিয়েছে এ দেশে তার পথ প্রদর্শক ছিলেন শ্যামাপ্রসাদ।

আসমুদ্রহিমাচল জুড়ে একসাথে কোনো সংগঠিত পরিকল্পনা ছাড়াই ভারত ছাড়ো আন্দোলনে অংশ নেওয়া জনগণের ধর্মীয় – ভাষাগত বৈচিত্র্য কখনোই এই গণ আন্দোলনকে বেগ দ্যায়নি,তার অন্যতম কারণ ওই আন্দোলনের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র। আন্দোলনের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রের গায়ে তাই সেদিন মুসলিম লীগ কিম্বা হিন্দু মহাসভা কেউই আঁচড়টুকু কাটতে পারেনি।

অন্যদিকে এই কারণে ব্রিটিশ রাজশক্তিতে গদগদ হয়ে উঠেছিলো সেদিন সাম্প্রদায়িক শক্তি হিন্দু মহাসভা।

★পঞ্চাশের মন্বন্তরে শ্যামাপ্রসাদের ভূমিকা★

———————————-

একটু গভীরে গেলেই দেখতে পাবেন, দেশ যখন স্বাধীনতা আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে,দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধে আক্রান্ত মানবতা-সভ্যতা ঠিক সেই সময় ‘ভারত ছাড়ো আন্দোলন’ এর বছর দেড়- দু’য়েকের মধ্যে ভয়ংকর পঞ্চাশের মন্বন্তর ( ১৯৪৩-৪৪) এর সময় তথাকথিত ‘মহান নেতা'(?) শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জিরা কি ভাবছিলেন…

মন্বন্তরে বাংলার মর্মান্তিক দুর্দশার দিনগুলিতে শ্যামাপ্রসাদ পরিচালিত ‘হিন্দুমহাসভা’-র অন্যতম প্রধান ইস্যু ছিল : ‘’সরকারী লঙ্গরখানাগুলিতে মুসলমান ও নিম্নবর্ণের মানুষদের নিয়োগ করার ফলে হিন্দুদের পক্ষে জাত যাওয়ার ভয়ে খাওয়া সম্ভব হচ্ছেনা…”ভাবুন, তিরিশ লক্ষ বাঙালি না খেতে পেয়ে মারা গেছে, সেরকম এক বিপর্যয়ের দিনে এ কেমন চিন্তাভাবনা ! ১৯৪২-এর ২৬ জুলাই বেঙ্গল গভর্নর জন হার্বার্টকে একটি চিঠি লিখে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী কংগ্রেসের বিরুদ্ধে মোকাবিলা করার এবং ‘ভারতছাড়ো আন্দোলন ‘কে দমন করার একটি প্ল্যান ছকে দেন। শ্যামাপ্রসাদ লিখলেন—-এর আগেই ১৯৪০ সালে বঙ্গীয় প্রাদেশিক সভার অধিবেশনে মুসলিম দের জন্য পৃথক রাষ্ট্রের দাবী পাশ করালেন ফজলুল হক। তারও আগে সম্ভবত ১৯৩৫ সালে ধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্র গঠনের একই সুর শোনা গিয়েছিলো একেবারে বিপরীত মেরুর(?) হিন্দু মহাসভার প্রাণ পুরুষ সাভারকারের মুখে।

এহো বাহ্য। আসল চমকটা অন্যত্র। ফজলুল হক মন্ত্রীসভা যখন ১৯৪০ এ পাকিস্তান প্রস্তাব গ্রহণ করে, সেদিন এর পর থেকেও প্রায় ১১ মাস ফজলুল হক মন্ত্রীসভার অংশীদার ছিলো হিন্দু মহাসভা। আর সেই মন্ত্রীসভার অর্থমন্ত্রীর নাম ছিলো–ড: শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়।

ড: শ্যামাপ্রসাদের পান্ডিত্য নিয়ে তাঁর অতিবড় শত্রুও রা’টি কাটতে পারবেন না এটা যেমন ঠিক। তেমনি পাশাপাশি এটাও ঠিক যে,চিরকালই তিনি ক্ষমতার অলিন্দে ঘোরাফেরা করতেইভালোবাসতেন। তাই প্রকাশ্যে মুসলিম লিগের চরম বিরোধীতা করলেও মুসলিম লিগের দেওয়া অর্থ মন্ত্রক এর ক্ষমতা যেমন ভোগ করেছিলেন তেমনি কংগ্রেস বিরোধীতা করলেও জহরলালের মন্ত্রীসভায় মন্ত্রী হতে তিনি কালক্ষেপ করেননি। আবার ১৯২৫ এ কংগ্রেস এর টিকিটে নির্বাচিত হয়েও পরবর্তীকালে কংগ্রেস ছাড়তেও তাঁর বেশি সময় লাগেনি।

ইদানীং শোনা যায়,পশ্চিমবঙ্গ নাকি শ্যামাপ্রসাদের জন্যই ভারতে আছে। ১৯৪৬ এর নির্বাচনে বাংলা প্রদেশে নিরঙ্কুশ সংখ্যা গরিষ্ঠতা পায় মুসলিম লিগ। প্রধানমন্ত্রী হন সোরাবর্দী। ৪৬ এর ১৬ অগাষ্ট মুসলিম লীগের “প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস” -এ রক্তাক্ত হয়ে ওঠে সারা দেশ এর সাথে কোলকাতাও। নোয়াখালির দাঙ্গা থামাতে গান্ধীজী যখন পদযাত্রা করছেন সেখানে,কোলকাতার বেলেঘাটাতে বসেছেন অনশনে। সেই সময় হিংসায় ইন্ধন জোগাতে যখন ব্যস্ত মুসলিম লীগ নেতারা তখন একই কাজ তাল রেখে করে যাচ্ছিলেন শ্যামাপ্রসাদের নেতৃত্বে হিন্দু মহাসভা।

এরপর এলো দেশ ভাগের ক্ষণ।তদানীন্তন সময়ে অবাস্তব – আবেগ হলেও শরৎ বসু,সোরাবর্দী এঁরা দুজনেই বাংলা – ভাগ মনে-প্রাণে চাননি বরং পৃথক বাংলা রাষ্ট্রকে গঠনের কথা বলেছিলেন পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে। উল্টো দিকে যখন দেশ-ভাগের প্রসঙ্গই ওঠেনি তখন থেকেই শ্যামাপ্রসাদ ছিলেন বাংলা ভাগের পক্ষে আবার হক মন্ত্রীসভা যখন পাকিস্তান প্রস্তাব গ্রহণ করে,তখন সে মন্ত্রীসভার সদস্য ছিলেন সেই শ্যামাপ্রসাদ।

কোলকাতা ছাড়া বাংলা কোনো পক্ষই নিতে গররাজি ছিলো। এত জুটমিল,এত কারখানা! বাংলার অর্থনৈতিক বুনিয়াদ সে সময়ও কোলকাতা ভিন্ন অবাস্তব ছিলো। তাই ভারত ভাগের সময় কংগ্রেস ও কোলকাতা ছাড়তে নারাজ ছিলো। এতে শ্যামাপ্রসাদ এর কৃতিত্ব কোথায়?

আসলে শ্যামাপ্রসাদ স্বাধীন বাংলার মুখ্যমন্ত্রীত্বের স্বপ্ন দেখতেন তাই সুযোগ বুঝে একদা যাদের মন্ত্রীসভার অর্থ মন্ত্রী ছিলেন তিনি,সময়- সুযোগ বুঝে সেই মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে গলা চড়ানোর নাটক করলেন।পাকিস্তানের প্রস্তাবক ফজলুল হক আর শ্যামাপ্রসাদ’রা হাত মেলান যুগে যুগে। এখানেই মিল সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী শক্তিগুলোর মধ্যে।সেই ট্রাডিশন সমানে চলেছে…

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published.