ফ্যাসিবাদ বিরোধী রবীন্দ্রনাথ

দিলীপ চক্রবর্তীঃ

এবছর ২৫ বৈশাখ ইংরাজী দিনাঙ্ক অনুযায়ী ৯ মে। ১৯৪৫ সালে ৯ মে ফ্যাসিবাদকে পরাস্ত করে মানবসভ্যতা জয়ী হয়। রবীন্দ্রনাথ ফ্যাসিবাদের পরাজয় দেখে যেতে পারেন নি- অথচ তিনি তাঁর জীবনের শেষ মূহুর্ত পর্যন্ত সভ্যতার সংকট অবসানে ফ্যাসিবাদের পরাজয় কামনা করে গিয়েছেন।

রবীন্দ্রনাথের জন্ম হয়েছিল ১৮৬১ সালের ৭ মে,বাংলা দিনপঞ্জী অনুযায়ী ২৫ বৈশাখ। তিনি বেঁচেছিলেন ৮০ বছর।১৯৪১ সালের ৮ আগষ্ট বা বাংলা ২২ শ্রাবন তাঁর জীবনাবসান ঘটে।অর্থাৎ তার প্রয়ানের ৮১ বছর অতিক্রম করেছে।তিনি বেঁচে নেই,কিন্তু তিনি বেঁচে আছেন।আমরা আমাদের জীবনের বিশেষ মুহূর্তগুলি যেমন শোক,আনন্দ বা সংগ্রামের সময় তার রচিত গান,কবিতা বা প্রবন্ধে আমরা আশ্রয় খুঁজি।এবছর তাঁর ১৬২ তম জন্মদিবস।

এবছর রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সভ্যতার জয়লাভের দিনটি মিলেমিশে যাওয়ায় দিনটির তাৎপর্য বেড়ে গিয়েছে। শুধু ভারতবর্ষ নয় সারা বিশ্বে ফ্যাসিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রামে অন্যতম প্রেরণা ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। ১৯২৭ সালে প্রখ্যাত ফরাসী বুদ্ধিজীবী অঁরি বারাবুসকে সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে রবীন্দ্রনাথের স্বাক্ষর চেয়ে একটি চিঠি দেন।রবীন্দ্রনাথ ঐ আবেদনে স্বাক্ষর দিয়ে তাঁকে দেওয়া ব্যক্তিগত চিঠিতে লেখেন-

এই আবেদন অসংখ্যের কন্ঠস্বর ধ্বনিত করবে-সভ্যতার অন্তঃস্থল থেকে হিংসার আকস্মিক বিস্ফারণে যারা বিপন্ন। “১৯৩৪ সালে গোর্কি,রঁম্যা রোঁলা,বারবুস প্রমুখের উদ্যোগে ফ্যাসিবাদ থেকে সংস্কৃতি রক্ষার জন্য যে সম্মেলন হয়েছিল তাতে ভারতীয় মনীষীদের পক্ষ থেকে এক লিখিত ইস্তাহার পাঠান হয়। তাতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর,পন্ডিত জওহরলাল নেহেরু, মুন্সী প্রেমচাঁদ,শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়,নন্দলাল বসু প্রমূখের স্বাক্ষর ছিল। স্পেন,আবিসিনিয়ায় আগ্রাসী ফ্যাসিবাদদের আক্রমনে ক্ষুব্ধ হন রবীন্দ্রনাথ- তাঁর ক্ষোভ প্রকাশ পায় শিশুতীর্থ ও প্রান্তিকের কবিতায়।১৯৩৭ সালে ভারতে তৈরী হল রবীন্দ্রনাথের সভাপতিত্বে ফ্যাসিবাদ ও যুদ্ধ বিরোধী সঙ্ঘ। এই সংগঠনে দেশের বিভিন্ন রাজ্যের লেখক, শিল্পী, রাজনীতিবিদরা যুক্ত হলেন।তাদের মধ্যে মুন্সী প্রেমচাঁদ, নন্দলাল বসু,জওহরলাল নেহেরু,তুষারকান্তি ঘোষ,এস এ ডাঙ্গে,জয়প্রকাশ নারায়ন,শিবনাথ ব্যানার্জী প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য।সোমেন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন সাধারন সম্পাদক।ফ্যাসিবাদবিরোধী পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের প্রেরনা ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। নাৎসিদের সাথে যুদ্ধে যেদিন প্যারির পতন হয় সেদিন স্বাধীন প্যারি বেতার কেন্দ্রে সবশেষ যে নাটকটি পরিবেশিত হয় তা হল আন্দ্রে জিও অনুদিত রবীন্দ্রনাথের ‘ডাকঘর’। নাটকের শেষ পংক্তিতে ছিল অমলকে বলো সুধা তাকে ভোলে নি। একসঙ্গে তারা একটি পংক্তি যোগ করে ‘স্বাধীনতাকে বলো প্যারি তাকে ভোলে নি’। পোলান্ডের বন্দী শিবিরে এক বন্দী শিক্ষক রবীন্দ্রনাথের অনুদিত কবিতা শিখিয়েছিলেন কিশোর বন্দীদের।তারা তা বলে মাথা উঁচু করেই কোন ভয় না পেয়ে গ্যাস চেম্বারে ঢুকেছিলেন।আর্জেন্টিনার স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রেরনা ছিল রবীন্দ্রনাথের গান। ওই দেশে অজানা সৈনিকদের স্মৃতিতে নির্মিত বেদীতে ভিক্টোরিয়া ওকাম্পা অনুদিত ” ও আলোর দেশের যাত্রী” খোদাই করা আছে।

আমি ভিয়েতনামের তরুন তরুনীদের কাছে শুনেছি তারা তাদের স্বাধীনতার যুদ্ধে কিভাবে প্রেরনা পেয়েছেন রবীন্দ্রনাথের লেখাগুলি থেকে। আর বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধারা কেমন করে রবীন্দ্রনাথকে হৃদয়ে রেখেছেন তা দেখার অভিজ্ঞতা আমার নিজেরই আছে।আমাদের দেশের স্বাধীনতা যোদ্ধারা বিভিন্ন কারাগারে,আন্দামানের সেলুলার জেলে বা ফাঁসির মঞ্চে জীবন দেওয়ার সময়েও কিভাবে রবীন্দ্রনাথ তাদের পাশে তা নিয়েও বহু লেখা আছে।আবার জালিয়ানওয়ালাবাগে হত্যাকান্ড, হিজলী জেলে গুলি চালানোর প্রতিবাদে বা বঙ্গভঙ্গের রদ করার আন্দোলনে তাঁর বলিষ্ঠ ভূমিকা আমরা শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি।সামাজিক শোষণ, ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে তাঁর সোচ্চার হওয়ার কথাও ভারতবাসী জানে। ভারতের জাতীয় নেতৃত্ব যেমন মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহেরু, সুভাষ চন্দ্র বসু,খান আব্দুল গফফর খান প্রমুখের সাথে তার ঘনিষ্ঠতাও আমরা জানি।জওহরলাল তাঁর কিশোরী কন্যা ইন্দিরাকে শান্তিনিকেতনে পাঠিয়েছিলেন পড়াশোনার জন্য। গফফর খানের পুত্রও পাঠ নিতে শান্তিনিকেতনে এসেছিল।মহাত্মা গান্ধী চাঁদা তুলে আর্থিকভাবে বিশ্বভারতীর পাশে এগিয়ে এসেছিলেন।

ফ্যাসিবাদ, ধর্মান্ধতা,বর্ণবৈষম্যবাদ,উগ্র জাত্যাভিমানের বিরোধী ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। ছোটগল্পে,নাটকে,কবিতায়,উপন্যাসে,গদ্যে তা উঠে এসেছে বারবার। ধনবাদের মানবিকতা বিরোধী, রূপও তিনি তুলে ধরেছেন সমাজকে সচেতন করতে।তিনি তার নিজের জীবনে আধুনিক মানবতাবাদী সমাজের কথা বলেছেন তেমনি সমাজ প্রগতির সমস্ত বাধার বিরুদ্ধে সংগ্রামের প্রেরণা হিসাবে এসেছেন।বর্তমানে এক কঠিন সময়ের মধ্যে দিয়ে মানবসভ্যতাকে অগ্রসর হতে হলেও ধর্মান্ধতা,উগ্র জাত্যাভিমান,আগ্রাসী ধনবাদ মানুষের সমস্ত অধিকারকে যেন কেড়ে নিতে চায়। এর বিরুদ্ধে লড়াই এ প্রগতিমনা মানুষটির মধ্যেও যেন হতাশা।এ এক অসহনীয় হতাশা।একদা কিশোর কবি সুকান্ত লিখেছিলেন–

” আমার প্রার্থনা শোন হে পঁচিশে বৈশাখ তুমি আরেকবার জন্ম দাও রবীন্দ্রনাথের”

এবারের পঁচিশে বৈশাখ এটা যেন আমাদেরই প্রার্থনা।ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইএ রবীন্দ্রনাথ আবার আমাদের প্রেরণা হিসাবে আসুক।

ছবিঃ উইকিপিডিয়া থেকে সংগৃহীত।

( মতামত লেখকের ব্যক্তিগত। লেখক ‘সপ্তাহ’ পত্রিকার সম্পাদক।)

#tagore&congressidea

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published.