বাংলাদেশের অমর একুশে সংগীতের স্রষ্টা আবদুল গাফফার চৌধুরী’র প্রয়াণ”

( আব্দুল গাফফার চৌধুরীর স্মরণে আন্দোলন ডট ইন -এর জন্য কলম ধরলেন ওপার বাংলার বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী কামরুল ইসলাম।)

বাংলাদেশের মুক্তচিন্তার অসাম্প্রদায়িক চেতনার অগ্রসর চিন্তক ছিলেন আবদুল গাফফার চৌধুরী। গত ১৯ মে ২০২২ তারিখে অসুস্থতাজনিত কারণে লন্ডনের একটি হাসপাতালে ইহধাম ত্যাগ করেন। এই সংবাদ বাংলাদেশসহ বিশ্বে বসবাসরত বাঙালিরা গভীরভাবে শোকাহত হয়েছে। বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন, সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধসহ সকল ক্ষেত্রেই তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁর অমর কীর্তি গৌরবের অধ্যায় সৃষ্টি করেছে। জীবন-জগতের নিয়ম অনুযায়ি তিনি দেহত্যাগ করলেও, তিনি যে ঐশ্বর্যের অনন্য ভান্ডার রেখে গেছেন, তারমধ্যেই তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। তাঁর কালজয়ী সংগীত “আমার ভাউয়ের রক্তে রাঙানো”র সাথে তথা বাঙালির মনে চিরাঙ্কিত থাকবেন।

আবদুল গাফফার চৌধুরী (১২ ডিসেম্বর ১৯৩৪ — ১৯ মে ২০২২)র জীবন-কর্ম সুবিশাল ও বিস্তৃত। তিনি লেখক, সাংবাদিক, কলাম লেখক, চিন্তক, বুদ্ধিজীবী হিসেবে অসামান্য অবদান রেখেছেন। বাংলাদেশের বরিশাল জেলার মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার উলানিয়া গাঁয়ে ১৩ ডিসেম্বর ১৯৩৪ সালে জন্মগ্রহণ করেন। কিশোর বয়স থেকেই সাহিত্যচর্চার সূচনা, যা আমৃত্যু অব্যাহত রেখেছেন। ১৯৪৭ সালে ‘কংগ্রেস হিতৈষী’ পত্রিকায় সাংবাদিকতার সাথে জড়িত হন। পত্রিকাটা সম্পাদনা করতেন তৎকালিন সময়ে প্রখ্যাত কংগ্রেস নেতা দুর্গা মোহন সেন। বরিশালে থাকাকালিন সময়ে বামপন্থী সংগঠন–RSP এর সাথে জড়িত হন। জীবনের নানা সংগ্রাম, বহু প্রতিকূল পরিস্থিতিতে তিনি সাহসের সাথে অগ্রসর হয়েছেন। তাঁর কর্মজীবন পর্যালোচনা করলে তারই সাক্ষ্য বহন করে। তিনি দৈনিক ইনসাফ পত্রিকায় (১৯৫০-৫১) সাংবাদিক, দৈনিক সংবাদে (১৯৫১-৫২) অনুবাদক, দৈনিক সওগাতে (১৯৫৩-৫৬) ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, একইসময়ে মাসিক নকীব পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, ‘দিলরূবা’ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৬ সালে দৈনিক ইত্তেফাকের সহকারী সম্পাদক, সাহিত্য পত্রিকা ‘মেঘনা’র সম্পাদক,রাজনৈতিক পত্রিকা ‘চাবুকের সম্পাদক, পরে দৈনিক আজাদ, মাসিক মোহাম্মদী, দৈনিক জেহাদ পত্রিকায় সম্পৃক্ত ছিলেন। ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৬-দফা ঘোষণা দেন। সেইসময় ৬-দফাা সংগ্রামের প্রচারে মুখপাত্র ‘দৈনিক আওয়াজ’ বের করেন। পূর্ব বাংলার উত্তাল আন্দোলনের সময় তিনি যে মননশীল সংগ্রাম অব্যাহত রাখেন, তা সত্যিই বিস্ময়ের সৃষ্টি করে। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় মুজিবনগর সরকারের মুখপাত্র ‘জয় বাংলা’য়, কলকাতায় দৈনিক আনন্দবাজার, যুগান্তর’ পত্রিকায় লেখালেখি করেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হলে দৈনিক জনপদ প্রকাশ করেন। বাংলাদেশের স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে দেশ পুর্নগঠনে অব্যাহত প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখেন। ১৯৭৩ সালে আলজিয়ার্স সম্মেলনে যোগ দেন। ১৯৭৪ সালে সহধর্মিণীর অসুস্থতার কারণে চিকিৎসার জন্য লন্ডনে পাড়ি দেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু ও পরিবারের সদস্যরা ( বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা ব্যতিত )ঘাতকের নির্মম হত্যাযজ্ঞে শাহাদাত বরণ করলে তিনি আর ফিরে আসেননি। বাংলাদেশের পুর্নজাগরনের জন্য ‘ বাংলার ডাক’ নামক সাপ্তাহিক পত্রিকার সম্পাদনা করেন।১৯৮৭ সালে নতুন দিন, ১৯৯০ সালে দৈনিক নতুন দেশ, ১৯৯১ সালে দৈনিক পূর্বদেশ প্রকাশ করেন। প্রবাসে অবস্থান করেও তিনি বাংলাদেশের বিভিন্ন দৈনিক ও সাময়িকীতে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে, ধর্মান্ধতার বিরূদ্ধে, উগ্র সন্ত্রাস সাম্প্রদায়িকতার প্রতিবাদে নিয়মিত রাজনৈতিক কলাম লেখেন। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সময়ে তাঁর দিকনির্দেশনামূলক কলাম মুক্তচিন্তার বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করি। বঙ্গবন্ধু কন্যা, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা তাঁর কলামের দিকনির্দেশনাকে অধিকতর গুরুত্ব দিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। বাংলাদেশের রাজনীতি অর্থনীতি নিয়ে তাঁর বিশ্লেষণ যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করেছে। তাঁর বেশ কয়েকটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে, তারমধ্যে উল্লেখযোগ্য, ডানপিটে শওকত (১৯৫৩), কৃষ্ণপক্ষ (১৯৫৯), সম্রাটের ছবি (১৯৫৯), সুন্দর হে সুন্দর (১৯৬০), চন্দ্রদ্বীপের উপাখ্যান (১৯৬০), নাম না জানা ভোর (১৯৬২), নীল যমুনা (১৯৬৪), শেষ রজনীর চাঁদ (১৯৬৯), সম্পাদনা: বাংলাদেশ কথা কয় (১৯৭২), আমরা বাংলাদেশী নাকি বাঙ্গালী (১৯৯৩), পলাশী থেকে ধানমণ্ডি (২০০৭), বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনী ভিত্তিক একটি চলচ্চিত্রের কাহিনী।

তাঁর অনন্য কর্মের স্বীকৃতিসূরূপ বাংলাদেশের বাংলা একাডেমী পুরস্কার (১৯৬৭), একুশে পদক (১৯৮৩), স্বাধীনতা পদক (২০০৯) সহ জাতীয় আর্ন্তজাতিক সম্মাননা ও পদক পেয়েছেন।

তিনি আশাবাদী মানুষ ছিলেন। সেজন্য তিনি সকল নিরাশার ভেতর লেখেন, “আমি নিরাশ নই। আমি সাময়িকভাবে হতাশ। কারণ আমরা যা চেয়েছিলাম, তা আমাদের জীবদ্দশায় বোধহয় আর দেখে যেতে পারব না,”। কিন্তু তিনি স্বপ্নচারীর মতো কবিতায় প্রকাশ করেন, মশাল কি নিভে গল বন্ধু/ সূর্যের রংমাখা রোদ্দুর/ রক্ত কি মুছে গেল বন্ধু/ এই ঘোর অমানিশা কদ্দূর”। তাঁর সকল কর্মে দেশপ্রেম প্রকট ছিল। ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার সংগ্রাম, সামরিক স্বৈরাচার বিরোধী গণতান্ত্রিক সংগ্রামে তিনি অনন্য সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। বাংলাদেশের ইতিহাসের সাথে তাঁর নাম অনন্তকাল মিলেমিশে বহমান থাকবে। মাত্র একুশ বছর বয়সে লেখা ‘ আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ সংগীত যেন ভাষা সংগ্রামের ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে। বিবিসির স্রোতা জরিপে বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ সংগীতের তালিকায় তৃতীয় স্থানে উঠে এসেছে। এই সংগীত বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক রাজনৈতিক অধিকারের অনুপ্রেরণা হিসেবে চিরকাল বাহিত হবে। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে পাকিস্তানের স্বৈর সরকারের গুলিতে বিধ্বস্ত হয়ে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। আবদুল গাফফার চৌধুরী সেইসময় ঢাকা মেডিকেলে ভাষা শহীদ ও আহতদের দেখতে যান। ভাষা শহীদ রফিকের মাথার খুলি উড়ে যাওয়া লাশ মেডিকেলের বহির্বিভাগে দেখে তিনি আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। ভাষা সংগ্রামীদের রক্তভেজা করুণ দৃশ্য দেখে তিনি লেখেন এই ঐতিহাসিক গানটি। বাংলাদেশের মানুষ প্রভাতফেরির সময় এই গানটি সকলে মিলে পরিবেশন করতে করতে নগ্ন পায়ে শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানাতে যায়। গানটির প্রথমে সুর দিয়েছিলেন আবদুল লতিফ। পরে সুর প্রদান করেন প্রখ্যাত সুরকার আলতাফ মাহমুদ। বাংলাদেশের ইতিহাসের সাথে অবিচ্ছেদ্য উপাদান হিসেবে সংগীতটি পরিগণিত হয়েছে। বাংলাদেশ ও বাংলা ভাষার প্রতি আবদুল গাফফার চৌধুরীর অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published.